সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

‘Deep State’: Bangladesh in the behind-the-scenes invisible power game

দেশ-বিদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ও রহস্যঘেরা একটি শব্দ ‘ডিপ স্টেট’ বা গুপ্ত শক্তি। দৃশ্যমান সরকারের আড়ালে থেকে রাষ্ট্রের নীতি, ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণকারী অদৃশ্য প্রভাববলয়কেই

দেশ-বিদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ও রহস্যঘেরা একটি শব্দ ‘ডিপ স্টেট’ বা গুপ্ত শক্তি। দৃশ্যমান সরকারের আড়ালে থেকে রাষ্ট্রের নীতি, ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণকারী অদৃশ্য প্রভাববলয়কেই সাধারণত ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়। পৃথিবীর পরাশক্তি কিংবা ক্ষমতাধর দেশগুলোতে সামরিক-বেসামরিক আমলা, গোয়েন্দা সংস্থা, করপোরেট গোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা অনেক সময় রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। টেলিভিশন টকশো, সেমিনার এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ।

পর্দার আড়ালের ক্ষমতার কাঠামো

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো ও সরকারের আড়ালে কাজ করা এক প্রভাবশালী, স্বার্থান্বেষী ও সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কই হলো ‘ডিপ স্টেট’। সরকার পরিবর্তন, নির্বাচন কিংবা গণঅভ্যুত্থানের পরও অনেক সময় রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে না। কারণ, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক শক্তির একটি অংশ পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক সরকার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থা বা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে। তখনই ‘ডিপ স্টেট’-এর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন সামনে আসে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডিপ স্টেট

বাংলাদেশে ডিপ স্টেট বলতে নির্দিষ্ট কোনও একক সংস্থাকে বোঝানো হয় না। বরং এটি হলো— দলীয়করণ হওয়া আমলাতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং বিচার বিভাগের একটি অংশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা অদৃশ্য প্রভাববলয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বৃদ্ধি পায়। ফলে নির্বাচনী বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখতে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কাজ করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়েও বিভিন্ন মহলে বিতর্ক রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, এসব নির্বাচনে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিগুলোর সমন্বিত ভূমিকা ছিল।

গণঅভ্যুত্থান ও নতুন বিতর্ক

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ‘ডিপ স্টেট’ নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কার উদ্যোগ নিলে প্রশাসনের ভেতর ও বাইরে থেকে নানা ধরনের প্রতিরোধের অভিযোগ ওঠে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি, ফাইল আটকে রাখা কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির ঘটনাকে অনেকে ‘ডিপ স্টেটের প্রতিরোধ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী অর্থনৈতিক সিন্ডিকেটও এই অদৃশ্য শক্তির অংশ হিসেবে কাজ করে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো অপরিবর্তিত থেকে যাওয়ায় এই আলোচনা আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ‘ডিপ স্টেট’-এর গোড়াপত্তন মূলত ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের সামরিক শাসনের সময়। ওই সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তুলনায় সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামো রাষ্ট্র পরিচালনায় বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

১৯৯০ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরও সেই কাঠামো পুরোপুরি ভাঙেনি। বরং সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, ব্যাংক লুট ও অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট এবং রাজনৈতিক সুবিধাভোগী শ্রেণি।

আসিফ মাহমুদের বক্তব্য

গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক আলোচনা সভায় দলটির মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু দেশি-বিদেশি শক্তি ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল। যদিও তিনি নির্দিষ্টভাবে কারও নাম উল্লেখ করেননি। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার বিভিন্ন আলোচনায় বলেছেন, ডিপ স্টেট হলো এমন একটি স্থায়ী বন্দোবস্ত, যা সংবিধান, আমলাতন্ত্র, করপোরেট পুঁজি এবং বিদেশি শক্তির সমন্বয়ে গঠিত। তার মতে, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন না হলে সরকার বদলালেও প্রকৃত ক্ষমতা একই বলয়ের হাতেই থেকে যায়।

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, “ডিপ স্টেট শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কোনও না কোনওভাবে বিদ্যমান। সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী অদৃশ্য শক্তিগুলো অনেক সময় অপরিবর্তিত থেকে যায়।”

তার মতে, বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র নেপথ্যে থেকে সরকার পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

বাস্তবতা নাকি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব?

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ডিপ স্টেট কোনও কাল্পনিক বিষয় নয়। রাষ্ট্রের স্থায়ী আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থা ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর নিজস্ব স্বার্থ থাকে এবং তারা সেই স্বার্থ রক্ষায় প্রভাব বিস্তার করে।

তবে বিপরীত মতও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, অনেক সময় ব্যর্থ রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের অযোগ্যতা বা ব্যর্থতা আড়াল করতে ‘ডিপ স্টেট’-এর তত্ত্ব সামনে আনে। জনগণের সহানুভূতি অর্জন কিংবা রাজনৈতিক দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবেও এই শব্দ ব্যবহার করা হয়।

তবুও বাস্তবতা হলো— বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘ডিপ স্টেট’ এখন শুধু একটি তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ক্ষমতার কাঠামো বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন