সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

US technology advanced underwater glider recovered in Bay of Bengal

বরগুনার উপকূলীয় উপজেলা পাথরঘাটায় বঙ্গোপসাগর থেকে জেলেদের জালে আটকে পড়া আট ফুট দীর্ঘ টর্পেডো আকৃতির ডিভাইসটি কোনো সাধারণ বেসামরিক বয়া বা মৎস্য আহরণের সরঞ্জাম নয়।

বরগুনার উপকূলীয় উপজেলা পাথরঘাটায় বঙ্গোপসাগর থেকে জেলেদের জালে আটকে পড়া আট ফুট দীর্ঘ টর্পেডো আকৃতির ডিভাইসটি কোনো সাধারণ বেসামরিক বয়া বা মৎস্য আহরণের সরঞ্জাম নয়। এটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অত্যাধুনিক চালকহীন ডুবোযান (আন্ডারওয়াটার গ্লাইডার)। সামরিক ও বৈজ্ঞানিক উভয় ধরনের গোপন মিশনে ডেটা সংগ্রহের সক্ষমতা সম্পন্ন এই বিশেষ যুদ্ধকৌশলগত ডিভাইসটি বর্তমানে সরকারি হেফাজতে রয়েছে। গত ৩১ মে বিকেলে পাথরঘাটার জেলেরা গভীর সমুদ্র থেকে তাদের জালে অপ্রত্যাশিতভাবে এই ৮ ফুট দীর্ঘ আন্ডারওয়াটার ভেহিকলটি উদ্ধার করেন। এর ভেতরে নিখুঁত তারের বিন্যাসসহ নানাবিধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস রয়েছে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ডিভাইসটি ডুবোযান তৈরিতে বিশেষায়িত মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘টেলিডাইন ওয়েব রিসার্চ’ (Teledyne Webb Research)-এর তৈরি একটি ‘স্লকোম গ্লাইডার’। মার্কিন নৌবাহিনী গত এক দশকে এই মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ ধরনের ২১০টিরও বেশি গ্লাইডার সংগ্রহ করেছে।

উদ্ধারকৃত গ্লাইডারের গায়ে থাকা ব্যাচ নম্বর উল্লেখ করে মার্কিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টেলিডাইন ওয়েব রিসার্চকে ইমেইলের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, এই গ্লাইডারটি তারা কোন দেশের বা কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করেছিল। তবে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি এই মেইলের কোনো জবাব দেয়নি।পরবর্তীতে এর কন্ট্রোল মডিউল যাকে ডুবোযানের ‘মস্তিষ্ক’ বলা হয় তা কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে ‘ঢাকা পেপার্স’ ডিভাইসটির একটি নির্দিষ্ট সিরিয়াল নম্বর (S/N) সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। কন্ট্রোল মডিউলের ভেতরেই গোটা ডুবোযানের অপারেটিং সিস্টেম ও ডেটা চিপ থাকে, যা অনবরত সেন্সর থেকে আসা তথ্য জমা করে। এই সিরিয়াল নম্বর, বারকোড ও প্রস্তুতকারকের বিশেষ চিহ্ন নিশ্চিত করে যে, এটি মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য তৈরি করা বিশেষ লটেরই একটি পণ্য।

বাহ্যিক অবয়বে ডিভাইসটি নিরীহ মনে হলেও এর অভ্যন্তরীণ সামরিক সক্ষমতা নৌ-বিশেষজ্ঞদের রীতিমতো চমকে দিয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত ‘অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার’ বা সাবমেরিন শিকার এবং সাগরের মানচিত্র তৈরির নিখুঁত অস্ত্র।

এই গ্লাইডারে অত্যন্ত সংবেদনশীল সিটিডি (Conductivity, Temperature, Depth) সেন্সর রয়েছে, যা পানির পরিবাহিতা, তাপমাত্রা ও গভীরতা মেপে পানির স্তরে স্তরে লবণাক্ততার তারতম্য হিসাব করে। পানির নিচে তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তনের ওপর শব্দতরঙ্গের গতি নির্ভর করে। সাবমেরিনগুলো সাধারণত সাগরের নিচে ‘থার্মোক্লাইন লেয়ার’ বা শব্দ প্রতিফলিত করার স্তরের নিচে লুকিয়ে থাকে, যাতে প্রতিপক্ষের রাডার বা সোনার (Sonar) তাদের ধরতে না পারে। এই গ্লাইডারটি সেই লুকানোর জায়গার একটি নিখুঁত ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করে ফেলে, যা প্রতিপক্ষের সাবমেরিন সনাক্ত করা সহজ করে দেয়।

এর গায়ে থাকা বিশেষ অ্যাকোস্টিক সেন্সর দিয়ে এটি সমুদ্রের তলদেশের পাহাড়, খাত ও মাটির গঠনের ‘ব্যাথিমেট্রি’ বা থ্রি-ডি মানচিত্র তৈরি করে। এই ম্যাপগুলো পারমাণবিক বা সাধারণ সাবমেরিনকে সম্পূর্ণ অন্ধকার পরিবেশেও নিরাপদ চলাচলে সাহায্য করে।

এই ডুবোযানটির চলার পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও গোপন। এতে প্রথাগত কোনো বড় ইঞ্জিন বা প্রোপেলার (পাখা) নেই, ফলে এটি কোনো শব্দ বা কম্পন তৈরি করে না।এর নাকের ভেতরে একটি বিশেষ তেলের থলি এবং একটি ছোট বৈদ্যুতিক পাম্প থাকে। যখন এটি ডুব দিতে চায়, পাম্পটি থলি থেকে তেল টেনে ভেতরে নেয়। এতে এর আয়তন সামান্য কমে যায় এবং যন্ত্রটি পানির চেয়ে ভারী হয়ে নিচে নামতে শুরু করে। ওপরে ওঠার সময় পাম্পটি তেল আবার বাইরের থলিতে ঠেলে দেয়, যা একে হালকা করে তোলে। দুই পাশে থাকা দুটি স্থির ডানা এই ওপরে-নিচে যাওয়ার উলম্ব শক্তিকে অনুভূমিক শক্তিতে রূপান্তর করে। ফলে যন্ত্রটি সাগরের ভেতরে করাতের দাঁতের মতো আঁকাবাঁকা পথে অত্যন্ত নিঃশব্দে সামনে এগোতে থাকে।ধীরগতির (ঘণ্টায় মাত্র ১ থেকে ১.৫ কিলোমিটার) হলেও এর ব্যাটারি একটানা ৩ থেকে ১২ মাস সচল থাকতে পারে। কোনো শব্দ তৈরি না করায় যুদ্ধজাহাজের অতিসংবেদনশীল সোনার সিস্টেম বা হাইড্রোফোন সহজে এর উপস্থিতি টের পায় না, যা একে নিখুঁত গোয়েন্দা মিশনের আদর্শ হাতিয়ারে পরিণত করেছে।

গ্লাইডারটি সাগরের নিচে থেকে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ সংবেদনশীল ডেটা সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইরিডিয়াম স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক’-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে পাঠায়। ইরিডিয়াম হলো আমেরিকার একটি বৈশ্বিক যোগাযোগ সংস্থা, যার ৬৬টি কৃত্রিম উপগ্রহ পুরো পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে।গ্লাইডারটি যখন মিশন শেষে পানির উপরিভাগে আসে, তখন এর পেছনের খাড়া লেজটি অ্যান্টেন হিসেবে কাজ করে ইরিডিয়াম স্যাটেলাইটের সঙ্গে যুক্ত হয়। সংগৃহীত সব তথ্য একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং এনক্রিপ্ট করা প্রোপ্রাইটারি ফরম্যাটে মার্কিন গ্রাউন্ড স্টেশনে পাঠিয়ে দেয়। ডেটা পাঠানো শেষ হলে এটি স্যাটেলাইট থেকে নতুন কমান্ড বা জিপিএস লোকেশন গ্রহণ করে পুনরায় সাগরের গভীরে ডুব দেয়।

কূটনৈতিক ও সামরিক রেকর্ড অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর এবং সামগ্রিক ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী কৌশলগত উপস্থিতি রয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও মার্কিন নৌবাহিনীর সপ্তম নৌবহরের অন্যতম প্রধান ফ্ল্যাগশিপ জাহাজ ‘ইউএসএস ব্লুরিজ’ চট্টগ্রাম বন্দর ও বহির্নোঙ্গর এলাকায় অবস্থান করেছিল। সাধারণত এই ধরনের ওশেনোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল বা যুদ্ধজাহাজ থেকেই আন্ডারওয়াটার গ্লাইডারগুলো সাগরে অবমুক্ত করা হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গর এলাকা থেকে বরগুনার পাথরঘাটার উপকূলীয় অঞ্চলের সোজা নটিক্যাল দূরত্ব আনুমানিক ১৫০ থেকে ১৭০ কিলোমিটার (গড়ে ১৬০ কিলোমিটার)। গ্লাইডারটি যদি ঘন্টায় সর্বনিম্ন ১ কিলোমিটার গতিতেও চলে, তবে ১৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে,\frac{160 \text{ km}}{1 \text{ km/h}} = 160 \text{ ঘণ্টা} \approx 6.6 \text{ দিন} আর সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১.৫ কিলোমিটার গতিতে চললে সময় লাগবে প্রায় ১০৭ ঘণ্টা বা ৪.৫ দিন। অর্থাৎ, কোনো যান্ত্রিক বা নিয়ন্ত্রণ ত্রুটির কারণে যদি গ্লাইডারটি কেবল স্রোতের টানেও ভেসে আসে, তবে চট্টগ্রাম উপকূল থেকে পাথরঘাটায় পৌঁছাতে এর সময় লাগার কথা মাত্র ৫ থেকে ৭ দিন।

বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের বঙ্গোপসাগর নিয়ে গভীর আগ্রহ থাকলেও প্রকাশ্য উৎসে তাদের কারও কাছে এই ধরণের মার্কিন গ্লাইডার থাকার কোনো তথ্য নেই। চীনের কাছেও এই মার্কিন প্রযুক্তি সরবরাহের কোনো নজির নেই। অন্যদিকে, এই গ্লাইডার প্রোগ্রামটি মূলত মার্কিন নৌবাহিনীর অর্থায়নেই শুরু হয়েছিল এবং তারা এই প্রস্তুতকারক কোম্পানির প্রধান গ্রাহক।তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে ডিভাইসটির প্রস্তুতকারক এবং এর মার্কিন সামরিক সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হওয়া গেলেও, এটি নির্দিষ্ট কোন মার্কিন বা আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিচালনা করছিল, কী উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের জলসীমার এত কাছাকাছি মোতায়েন করা হয়েছিল এবং ঠিক কীভাবে এটি পাথরঘাটা উপকূলে এসে পৌঁছালতা এখনো রহস্যাবৃত। আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে এই রহস্যের উদঘাটন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন