বিএনপির নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নীতিকথা আমরা শুনে এসেছি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মুখ থেকে। সবচেয়ে সজ্জন, শিল্পসাহিত্যের প্রতি অনুরাগী, নীতিনিষ্ঠ রাজনীতিক হিসেবে তাকে তুলে ধরার একটা প্রয়াস আমরা দেখেছিলাম অনেক দিন। এটা ছিল ধারাবাহিক একটা প্রক্রিয়া। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে কেন্দ্র করে একটা ‘মিথ’ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তার কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি ভালো লাগত অনেকের, তার বক্তব্য শুনে হাততালি দিতো অনেকে; বেশ ফলাও করে সেগুলো প্রকাশও করত গণমাধ্যম।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আবার দেখা গেল অন্য রূপে। বিভিন্ন ভিডিয়োচিত্রে দেখা গেল তিনি কর্মীদের ধমকাচ্ছেন, সাধারণ মানুষদের ধমকাচ্ছেন; খারাপ ব্যবহার করছেন অনেকের সঙ্গে। তাকে ঘিরে আগের মিথের কারণে সেগুলো অবশ্য খুব বেশি প্রচার পায়নি। তবে তার দলের অনেকের মুখ থেকে জেনেছি এই ধরনের ঘটনা নিত্য ঘটাতেন তিনি; তবু মিডিয়ার চোখে তিনি ছিলেন অন্য। যেন এক ‘সুশীল রাজনীতিক’-এর প্রতিচ্ছবি। ভেতরে যাই হোক, সত্য কথা হলো অন্য অনেকের মতো আমিও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখি। আমিও তাকে নীতিনিষ্ঠ এক রাজনীতিক হিসেবে ভ্রান্তিমূলক জেনেও নির্মল আনন্দ পাই।
মির্জা ফখরুলকে ঘিরে এই গৌরচন্দ্রিকা যদিও, তবু বলছি এই লেখার মূল বিষয় তিনি নন। তিনি কেবলই একটা ছোট্ট অংশ। লিখছি এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড—বিসিবিকে নিয়ে।
বিসিবি এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের সর্বনাশ করে গেছে ইউনূস-রেজিম। একেবারে টার্গেট করে করেছে তারা। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া থেকে শুরু করে আসিফ নজরুল—সর্বনাশের চূড়ান্ত অধ্যায় সমাপ্ত করে গেছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট পর্যন্ত খেলতে দেয়নি বাংলাদেশকে। অথচ বিশ্বকাপে খেলা যেকোনো ক্রিকেটার এবং যেকোনো দেশের জন্যে অতি-সম্মানের।
ক্রিকেটের সর্বনাশের যে মহা-পরিকল্পনা, সেটা কিন্তু এখনও চলমান। কমিটির পর কমিটি হয়ে এখন চলছে অ্যাডহক কমিটি দিয়ে বোর্ড। এই অ্যাডহক কমিটি একটা নির্বাচন করতে যাচ্ছে, এবং সেখানেও পুনর্বাসন চলছে বিএনপি দলীয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-এমপি-প্রশাসক-বিএনপি নেতা ও তাদের আত্মীয়স্বজনের। জায়গা করে নিচ্ছে অ্যাডহক কমিটির সবাই এবং তাদের আত্মীয়স্বজনেরাও।
সরকার যে অ্যাডহক কমিটি করেছিল বিসিবির, সেখানে কাদের নিয়ে আসা হয়েছে—সেটা জানে সবাই। মির্জা ইয়াসির আব্বাস প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস এমপির পুত্র। সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পুত্র।
ইসরাফিল খসরু অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পুত্র। রাশনা ইমাম প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী।
এর বাইরে যাদের নিয়ে আসা হয়েছে তারাও কোনো-না-কোনো ভাবে বিএনপির লোকজন। এদের বেশিরভাগই আসন্ন বিসিবির নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, এবং কেউ কেউ বিনা-ভোটে পরিচালক হতে চলেছেন। এদের বাইরে আরও যারা পরিচালক হতে যাচ্ছেন, তাদের প্রায় সবাই কিন্তু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-এমপি-প্রশাসক-বিএনপি নেতাদের আত্মীয়স্বজন এবং এমনকি তামিম ইকবালের আত্মীয়ও।
গৌরচন্দ্রিকায় উল্লেখিত আমাদের মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাই মির্জা ফয়সল আমীন বিনা-ভোটে পরিচালক হতে যাচ্ছেন। একইভাবে বিনা-ভোটে পরিচালক হতে যাচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ছেলে মীর শাকরুল আলম ও প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতের ছেলে সাইদ বিন জামান। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীও বিনা-ভোটে হচ্ছেন বিসিবির পরিচালক।
নির্বাচনের মাঠে আছেন আরও একঝাঁক রাজনৈতিক মুখ ও তাদের স্বজনেরা।পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানীর চাচা মাঈন উদ্দিন চৌধুরী। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলামের ভাই শান্তনু ইসলাম। খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম। ভোলা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মুনতাসির আলম চৌধুরী। জি এম সিরাজ এমপির ছেলে আসিফ রব্বানী। আবুল কালাম এমপির ছেলে ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল।
কেবল কি বিএনপি? তামিম ইকবালই কম যাচ্ছেন না। নিজে তো বিসিবিতে থাকছেনই, বিসিবির পরিচালক হওয়ার পথে রয়েছেন তার ঘনিষ্ঠজন ও সাবেক ফ্র্যাঞ্চাইজি ফরচুন বরিশালের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান। মিজানুরকে না-হয় লড়তে হতে পারে নির্বাচনে, তবে তামিমের ফুফা সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীরের এই ‘প্যারা’ নেই; তিনি হচ্ছেন বিসিবির বিনা-ভোটের পরিচালক।
বিসিবি বলতে বোঝায়—‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড’; কিন্তু অনেকেই এটাকে এখন টিপ্পনী কেটে বলে থাকেন ‘বিএনপি ক্রিকেট বোর্ড- বিসিবি’। ব্যাকরণগতভাবে হয়তো এটা অসঠিক, কিন্তু প্রায়োগিক ও বাস্তবিক ভাবে এটা অনেকটাই সঠিক। উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গের বিসিবিতে পুনর্বাসনই এর বড় প্রমাণ।
আমাকে কি বলবেন—সবাই বিএনপি, আদর্শিক জায়গায় অভিন্ন; তাই বিসিবি এগিয়ে যাবে তরতর করে? কথা যদি এমন হয়, তবে বিসিবিকে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা না রেখে বিএনপির একটা সহযোগী প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলুন। এটা তো এমনিতেই বানানো হয়ে গেছে, কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি।
খেলোয়াড়ি জীবনে ফুটবলার ছিলেন আমিনুল হক, প্রতিমন্ত্রিত্ব-কালে ক্রিকেট নিয়ে কায়কারবার… বিসিবি কি বিসিবি, কেমন বিসিবি; বাংলাদেশ নাকি বিএনপির ক্রিকেট বোর্ড?
লেখক: কবির য়াহমদ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।