সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

Tahsin Afroz Emir Karantral’s Dahangatha

আমার জেলখানার রুট দিয়েই দাদার লাশ গেল দাফনের উদ্দেশ্যে। আমি জেল সুপারের পা ধরতে বাকি রেখেছিলাম যেন শেষবারের মতো দাদাকে একটু দেখতে দেওয়া হয়। উত্তরে

আমার জেলখানার রুট দিয়েই দাদার লাশ গেল দাফনের উদ্দেশ্যে। আমি জেল সুপারের পা ধরতে বাকি রেখেছিলাম যেন শেষবারের মতো দাদাকে একটু দেখতে দেওয়া হয়। উত্তরে বলা হলো ভাসুরের লাশ দেখা তো ভালো না! ক্ষোভে-ঘৃণায় আমার দম আটকে আসছিল। আমি তো ভাসুর নয়, আমার নিজের ভাইকে হারিয়েছিলাম।

এভাবেই নিজের কারান্তরালের দুঃসহ যন্ত্রণার কথা বর্ণনা করেছেন তাহসিন আফরোজ ইমি। গত ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানোর অপরাধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার হওয়া এই শিক্ষার্থী ও সমাজকর্মী সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তবে এই ১৫ দিনের কারাজীবন তাঁর জীবনে যে ক্ষত তৈরি করেছে, তা কোনো আইনি মুক্তি দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়।

ইমির ভাষায়, তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রেরণা ছিলেন তাঁর মেজো ভাসুর মেহেদী (যাকে তিনি ‘ছোট দাদা’ বলে ডাকতেন)। ইমির রাজনীতি ও ডাকসু নির্বাচনে দাঁড়ানোর প্রধান কারিগর ছিলেন এই মানুষটি। অথচ ইমি যখন কারাগারে, তখন গত ২৫ মার্চ চিরবিদায় নেন তাঁর প্রিয় ছোট দাদা। কারাগারের ভেতরে বসে ভাইয়ের জানাজায় যাওয়ার জন্য আকুতি জানালেও কারা কর্তৃপক্ষ তথাকথিত ‘সামাজিক রীতির’ দোহাই দিয়ে তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি। ইমি আক্ষেপ করে বলেন, সৃষ্টিকর্তা আমার কপালে সুখ বেশিদিন রাখেন না, তাই আমার কঠিন সময়ে পাশে থাকার মানুষটিকে কেড়ে নিলেন।

মাস্টার্সের ব্যস্ততার কারণে বিয়ের পর একটি মাসও সংসার করা হয়নি ইমির। কারাগারে থাকাকালীন পার করেছেন প্রথম রোজা ও প্রথম ঈদ। জীবনের প্রথম সেহরি স্বামীর সাথে করার স্বপ্ন থাকলেও তা ফিকে হয়েছে জেলের দেয়ালে। ৫ এপ্রিল জামিন না হওয়ার খবর শুনে ইমির বাবা স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হন। যে বাবা এক সময় অভিমান করে কথা বলতেন না, সেই বাবাই আজ মেয়ের লড়াই দেখে গর্বিত। এমনকি ৫ আগস্টের পর তিনবার বাড়ি ভাঙার চেষ্টা ও জমি দখলের পরেও ইমির পরিবার নতি স্বীকার করেনি।

মুক্তির আদেশ হওয়ার পরেও ‘ক্লিয়ারেন্স’ না থাকার অজুহাতে ইমিকে একদিন বাড়তি জেল খাটানো হয়। গেটে তাঁর পুরো পরিবার অপেক্ষা করলেও সামান্য দেখা করার সুযোগটুকু দেওয়া হয়নি। ইমি বলেন, জেল থেকে বের হয়ে বাবাকে সালাম করার পর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদলেন। আমার শাশুড়ি মা আমাকে শক্ত হতে বললেন। আমার স্বামী একাই পুরো ঝড় সামাল দিয়েছে, আমি পাশে থাকতে পারিনি এই আক্ষেপ সারাজীবনের।

ইমির অপরাধ ছিল কেবল জাতির পিতার ভাষণ বাজানো। দেশের ক্ষমতার পালাবদলে সরকার পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের ওপর অমানবিক ও বর্বর আচরণের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ইউনূস সরকারের পর তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ও এমন রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক গ্রেফতার এবং কারাগারে অমানবিক আচরণ সচেতন মহলকে স্তম্ভিত করেছে।

ইমি প্রশ্ন তুলেছেন, এতটা ক্ষত, এতটা ট্রমা কি আসলেই আমার প্রাপ্য ছিল?অমানবিক নির্যাতন আর প্রিয়জন হারানোর শোক বুকে নিয়ে ইমি যখন ঘরে ফিরলেন, তখন তাঁর চারপাশটা বদলে গেছে। কারাগারের শিকের ভেতর থেকে তিনি যে পৃথিবীটা রেখে গিয়েছিলেন, ফিরে এসে দেখলেন সেখানে তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয় ‘ছোট দাদা’ আর নেই।

ইতিহাস হয়তো এই অমানবিকতার বিচার করবে, কিন্তু ইমির হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে, তার উপশম কোথায়?

আরও পড়ুন