বাংলাদেশের টেলিভিশন টক-শোগুলো জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে এগুলোতে বিষয়বস্তুর একঘেয়েমি এবং আলোচক নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেশের টক-শো জগতের এই সংকীর্ণ চিত্রটি ফুটে উঠেছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশের শীর্ষ সাতটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের আলোচনায় ঘুরেফিরে কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ই প্রাধান্য পেয়েছে। এর মধ্যে ছিল, জুলাই পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে সংবিধানের পরিবর্তন ও রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার ছিল আলোচনার শীর্ষ এজেন্ডা। ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ছিল দীর্ঘ আলোচনা।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ‘জুলাই সনদ’-এর বাস্তবায়ন এবং বর্তমান সরকারের রূপরেখা নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো আলোচক নির্বাচনে চ্যানেলগুলোর ‘অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা’। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, হাতেগোনা কয়েকজন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং বিশেষ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বিভিন্ন চ্যানেলে বারবার উপস্থিত হচ্ছেন। এতে আলোচনার গভীরতা ও দৃষ্টিভঙ্গির বৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়ছে।
তথ্য অনুযায়ী, টক-শোতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বিএনপি-এর প্রতিনিধিদের উপস্থিতি অন্য সব দলের তুলনায় দৃশ্যমানভাবে বেশি ছিল। অন্যদিকে, অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি বা নতুন রাজনৈতিক ধারাগুলোর উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম, যা জনমতে একপাক্ষিক প্রভাব তৈরির শঙ্কা সৃষ্টি করছে।
মিডিয়া মনিটরের প্রতিবেদনে নারী অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এক বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে। যদিও অনুষ্ঠান উপস্থাপনার ক্ষেত্রে নারী সংবাদকর্মীদের জোরালো উপস্থিতি রয়েছে, কিন্তু ‘অতিথি’ বা ‘বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ ছিল হতাশাজনক। অর্থনীতি, নিরাপত্তা বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ডেস্কে নারী বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানোর হার ছিল নগণ্য।
যদিও রাজনীতি ও সংস্কার নিয়ে দীর্ঘ আলাপ হয়েছে, তবে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে নিরাপত্তা ঝুঁকি, জ্বালানি সংকট, এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির মতো জটিল ও সরাসরি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো প্রায়শই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে অথবা যান্ত্রিকভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টক-শো কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার। যদি নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক দল এবং গুটিকয়েক আলোচকের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে। তবে তা গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মতবৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে নতুন বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
এপ্রিল ২০২৬-এর এই প্রতিবেদনটি দেশের সাতটি প্রধান নিউজ চ্যানেল সময় টিভি, ডিবিসি নিউজ, একাত্তর টিভি, চ্যানেল আই, এনটিভি, নিউজ ২৪ এবং যমুনা টিভির টক-শোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।