সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

Red light in European market: ‘Made in Bangladesh’ tag is being removed from Finnish showrooms

তৌহিদ রিয়াদ,ফিনল্যান্ড ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তাতে বড় ধরনের ধস নামতে শুরু করেছে। ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলোর নামিদামি রিটেইল

তৌহিদ রিয়াদ,ফিনল্যান্ড

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তাতে বড় ধরনের ধস নামতে শুরু করেছে। ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলোর নামিদামি রিটেইল চেইন ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো এখন বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, তীব্র জ্বালানি সংকট এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতার কারণে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলছে।

আস্থা সংকটের নেপথ্যে তিন কাঁটা

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তিনটি প্রধান কারণে ফিনল্যান্ডের বায়াররা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছেন:

১. জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়: শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিয়মিত লোডশেডিংয়ের ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর দিয়ে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের দাম আর প্রতিযোগিতামূলক থাকছে না।

২. রাজনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি: বর্তমান অস্থিতিশীল পরিবেশকে ইউরোপীয় ক্রেতারা বড় ধরনের ‘বিজনেস রিস্ক’ হিসেবে দেখছেন। ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীল পরিবেশ বাংলাদেশে অনুপস্থিত বলে মনে করছেন তারা।

৩. শিপমেন্টে দীর্ঘসূত্রতা: সিজনাল ফ্যাশনের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উৎপাদন ও পরিবহন জটিলতায় বাংলাদেশের গার্মেন্টসগুলো সময়মতো শিপমেন্ট দিতে পারছে না, যার ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে ফিনিশ রিটেইল শপগুলো।

লাপেনরান্তার শো-রুমগুলোতে সরেজমিন চিত্র

ফিনল্যান্ডের লাপেনরান্তা শহরের গুরুত্বপূর্ণ শপিং মল ও শো-রুমগুলো ঘুরে এক হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। আগে যেখানে প্রতিটি স্টোরে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগের আধিক্য থাকতো, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে ভারত, চীন, ভিয়েতনাম ও জর্ডান।

  • স্পোর্টস গিয়ার (Stadium ও Intersport): এখানে এখন ভারত ও ভিয়েতনামের পণ্যের ছড়াছড়ি।
  • হাইপারমার্কেট (K-Citymarket ও Prisma): বাংলাদেশের বদলে পাকিস্তান ও চীনের পণ্য এখন তাক দখল করে আছে।
  • আউটডোর ও হাই-এন্ড ফ্যাশন (Luhta Galleria): জ্যাকেট ও প্রিমিয়াম পোশাকের অর্ডারগুলো এখন চলে যাচ্ছে জর্ডান ও ভিয়েতনামে।
  • ফ্যাশন চেইন (Lindex, Cubus, Tokmanni ও Kekäle): এসব আউটলেটে বাংলাদেশের পণ্যের সরবরাহ এখন অনিয়মিত এবং ঘাটতি স্পষ্ট।

বাজার চিত্র: বাংলাদেশ বনাম প্রতিদ্বন্দ্বী (সেপ্টেম্বর ২০২৫ – এপ্রিল ২০২৬)

সূচকবাংলাদেশ (বর্তমান প্রবণতা)প্রতিদ্বন্দ্বী (চীন, ভিয়েতনাম, ভারত)
অর্ডার ভলিউম২০-২৫% হ্রাস পেয়েছে১৫-১৮% বৃদ্ধি পেয়েছে
ডেলিভারি রেকর্ড৪০% পর্যন্ত শিপমেন্ট বিলম্বিত৯২-৯৫% অন-টাইম ডেলিভারি
ক্রেতার আস্থাঅত্যন্ত নিম্নগামী ও অনিরাপদস্থিতিশীল ও ঊর্ধ্বমুখী

চীন-ভিয়েতনাম ও ভারতের বাজার দখল

শো-রুমগুলোর প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর পর থেকে বাংলাদেশ থেকে নতুন শিপমেন্ট আসার হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এই সুযোগে চীন ও ভিয়েতনাম তাদের উন্নত লজিস্টিক চেইন ব্যবহার করে কৃত্রিম তন্তু ও উচ্চমূল্যের স্পোর্টস আইটেমের বাজার নিজেদের করে নিয়েছে। অন্যদিকে, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক ধারাবাহিকতার অভাবে ভারত তাদের টেক্সটাইল রপ্তানি বৃদ্ধিতে রেকর্ড গড়েছে।

বিশেষজ্ঞ অভিমত ও উত্তরণের পথ

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বিগত বছরগুলোতে অর্জিত ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারগুলো বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে। বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কৌশলগত সুবিধাগুলো ব্যবহার করতে না পারায় বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ দুটি—অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির মাধ্যমে হারানো বাণিজ্যিক সুবিধা পুনরুদ্ধার করা। এই দ্বিমুখী সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে ইউরোপের এই বিশাল বাজার পুনরায় ফিরে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন