২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তীব্র সাংগঠনিক সংকট ও নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাসের মুখে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন উঠেছে, চলতি বছরের শেষদিকে ভারত থেকে দেশে ফিরতে পারেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। আর তাঁর এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পর দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসতে পারে এক বড় ধরনের রদবদল। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে তিনি যেভাবে দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করেছিলেন, বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতেও চলতি বছর তিনি দলের ভেতরে এক বড় ধরনের সাংগঠনিক সংস্কারে যেতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
দলীয় সূত্র ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে একই মুখ থাকার কারণে তৃণমূলের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষোভ ও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছরে দল পরিচালনায় সমন্বয়হীনতা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব, দুর্নীতি এবং বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে শীর্ষ কয়েক নেতার জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে। বিশেষ করে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ঘিরে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। গত আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কার্যকর কৌশল নির্ধারণে ব্যর্থতা ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে দলের অনেক নেতাই তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণ ও অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য নেতাদের সামনে আনার চিন্তা করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। দলটির আগামীর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এখন রাজনৈতিক মহলে তিনজনের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে,মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী ও চট্টগ্রামের এই তরুণ নেতা আওয়ামী লীগের একাংশের কাছে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তরুণ প্রজন্মের সাথে তাঁর যোগাযোগ ও সাংগঠনিক দক্ষতা দলের জন্য বড় সম্পদ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্য একজন খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। যিনি সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। দিনাজপুর অঞ্চলে তাঁর শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আঞ্চলিক ভারসাম্য আনতেই তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা হতে পারে বলে আলোচনা চলছে।
এছাড়াও রয়েছে,আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। দলের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, যিনি মাঠপর্যায়ের রাজনীতি থেকে উঠে এসেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে দলের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জানা গেছে, শেখ হাসিনাকে বিদেশী একটি গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি একটি তালিকা দিয়েছে। যেখানে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে দল ও সাবেক সরকারের ১০ জন নেতার ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ ও জড়িত থাকার তথ্য রয়েছে। সূত্র মতে, আওয়ামী লীগের আসন্ন পুনর্গঠনে এই বিতর্কিত ও প্রভাবশালী নেতাদের বড় অংশই বাদ পড়তে যাচ্ছেন।
বাদ পড়ার তালিকায় ওবায়দুল কাদের ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ছাড়াও আরও যাঁদের নাম আলোচনায় আছে, তাঁরা হলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, দলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, বিপ্লব বড়ুয়া এবং জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে সক্রিয় হলে দুটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন। একটি দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং অন্যটি জনসমর্থন পুনরুদ্ধার। তবে দলের একটি অংশ মনে করছে, রাতারাতি বা তাৎক্ষণিকভাবে পুরো প্রজন্মগত পরিবর্তন হয়তো ঘটবে না; বরং সভাপতিমণ্ডলী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বা সাংগঠনিক সম্পাদক পর্যায়ে কিছু বড় পরিবর্তন এনে ধীরে ধীরে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হতে পারে।
দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে এবং সুবিধাভোগীদের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠে দলের কাঠামোকে পুনর্জীবিত করাই এখন আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দলটির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা না এলেও, অভ্যন্তরীণ আলোচনা এবং সাম্প্রতিক বাস্তবতায় এই রদবদলের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে, এই বিষয়গুলোতে দলের কোনো দায়িত্বশীল নেতার অফ-দ্য-রেকর্ড বক্তব্য বা অন্তত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।