শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার, পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ঘটনার নেপথ্যে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত উদ্ঘাটনের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় আন্দোলন আরও জোরদারের ঘোষণা দিয়ে সংগঠনটি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
বুধবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
তিনি জানান, আগামী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে মশাল মিছিল এবং শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। একই দাবিতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আবদুল্লাহ আল জাবের অভিযোগ করেন, বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কার্যক্রমে বারবার সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে এবং খুনিদের বিচারের আওতায় আনতে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন একাধিকবার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা আর কোনো ধরনের কালক্ষেপণ মেনে নেব না। জনগণ জানতে চায়, কারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এবং কেন এখনো তাদের বিচারের মুখোমুখি করা যাচ্ছে না।
ইনকিলাব মঞ্চের এই নেতা দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ও ‘ট্যাগ’ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না।
তার ভাষায়, ঘটনার পেছনে আরও গভীর কোনো দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে হলে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ভারতের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ওই বক্তব্যে এমন কিছু ইঙ্গিত রয়েছে, যা হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
তিনি বলেন, যদি সত্যিই এমন কোনো শক্তি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকে, যার পরিচয় প্রকাশ পেলে আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে, তাহলে তা জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পরপরই দেশের সীমান্তগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা উচিত ছিল। কিন্তু সে ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় অভিযুক্তরা দেশত্যাগের সুযোগ পেয়েছে।
তিনি বলেন, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে খুনিরা দেশ ছেড়ে গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে তথ্য এসেছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথায় দুর্বলতা ছিল? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা। তাদের দাবি, একটি বেসরকারি অনুসন্ধানী সংস্থা অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য খুনিদের পরিচয় প্রকাশ করতে পারলেও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো এখনো সন্তোষজনক অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, রাজধানীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একজন সম্ভাব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রার্থীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হলো। অথচ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খুনিরা দেশ ছাড়তে সক্ষম হয়েছে। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, গোয়েন্দা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ও জনসম্মুখে ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুনরায় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়। নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্কের অবসান ঘটাতে একটি স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য তদন্তই হতে পারে একমাত্র সমাধান।
তারা বলেন, শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিগত হত্যার ঘটনা নয়, এটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই এর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের প্রকাশনা সম্পাদক ফাহিম মীর, সদস্য হাবিবুল্লাহ মিসবাহসহ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।