দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈপ্লবিক রূপান্তরের মাধ্যমে কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনসহ প্রায় ৬টি বিষয়ের প্রথাগত অনার্স কোর্স বাতিল করে অন্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় দুই পাবলিক পরীক্ষা এসএসসি ও এইচএসসির বিষয় সংখ্যা এবং পরীক্ষার কর্মদিবস উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সনদনির্ভরতার পরিবর্তে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক করার বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এই বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি শীর্ষ সূত্র নিশ্চিত করেছে, উচ্চশিক্ষার ধারা বদলে আইটি এবং কারিগরি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতাভিত্তিক বিষয়। কলেজ পর্যায়েই শিক্ষার্থীদের জন্য চালু হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ ও বিশেষ ক্যারিয়ার সেন্টার। এছাড়া বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের উপযোগী করতে শেখানো হবে সাতটি বিদেশি ভাষা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্মসংস্থানের সংযোগহীন শিক্ষার কারণে দেশে গত ১৩ বছরে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার আট গুণ বেড়েছে। এই অচলাবস্থা কাটানোই নতুন সংস্কারের মূল লক্ষ্য। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ জানান, শিক্ষার্থীদের দক্ষ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁরা বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রমে হাত দিয়েছেন।
পাবলিক পরীক্ষার দীর্ঘ সময়সূচির কারণে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে এবং স্কুল-কলেজে স্বাভাবিক পাঠদান সচল রাখতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রাথমিক ধারণাপত্র তৈরি করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করতে ২৫ থেকে ৩০ দিন এবং এইচএসসিতে ৩০ থেকে ৩৫ কর্মদিবস লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিখন ঘণ্টা (লার্নিং আওয়ার্স) মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। নতুন পরিকল্পনায় পরীক্ষার কর্মদিবস ও বিষয় সংখ্যা কমিয়ে এই জটলা ও শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ দূর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, বিদ্যমান শিক্ষাক্রমকে বাস্তবসম্মতভাবে পরিমার্জন করে ২০২৭ সালে দেওয়া হবে। তবে ২০২৮ সাল থেকে যে সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রম চালু করা হবে, তাতে ৪টি নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে।
যুক্ত হতে যাওয়া নতুন ৪টি বিষয়, ক্রীড়া শিক্ষা (চতুর্থ শ্রেণি থেকে), সংস্কৃতি শিক্ষা (চতুর্থ শ্রেণি থেকে), কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে), লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস (ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে) ।
শিক্ষামন্ত্রী আরও জানান, নতুন শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি ‘তৃতীয় ভাষা’ শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বিগত ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত সব সমস্যা হয়তো এক দিনে সমাধান করা যাবে না। তবে আমাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা রয়েছে। যতটা দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে আমরা শিক্ষাব্যবস্থায় এই যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসব।