সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

ছেলেদের নামে নতুন ইউনিয়ন! বগুড়ায় প্রতিমন্ত্রীর ‘পারিবারিক’ নামকরণে তোলপাড়

স্থানীয় সরকার বিভাগের নতুন ইউনিয়ন পরিষদ গঠনের গেজেটে এক নজিরবিহীন ‘তুঘলকি কাণ্ড’ ঘটেছে। ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ঐতিহ্য ভেঙে খোদ

স্থানীয় সরকার বিভাগের নতুন ইউনিয়ন পরিষদ গঠনের গেজেটে এক নজিরবিহীন ‘তুঘলকি কাণ্ড’ ঘটেছে। ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ঐতিহ্য ভেঙে খোদ এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলে এবং তাঁর পারিবারিক বংশের নামে বগুড়ায় তিনটি নতুন ইউনিয়নের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গেজেট প্রকাশের পর এই ঘটনা নিয়ে স্থানীয় জনপদ থেকে শুরু করে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র তোলপাড় ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি অনুমোদিত নতুন গেজেটে বগুড়ার মোকামতলা এলাকায় ‘দিগন্ত’ ও ‘সীমান্ত’ নামে দুটি এবং শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রতিমন্ত্রীর বংশীয় পরিচয় অনুযায়ী ‘মীর’ নামে আরও একটি ইউনিয়নের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলের দাবি, ‘সীমান্ত’ নামটি সরাসরি এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্তের নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। একইভাবে ‘দিগন্ত’ নামটি তাঁর আরেক ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। প্রতিমন্ত্রীর প্রকাশ্য জীবনী ও পারিবারিক তথ্যেও তাঁর দুই ছেলের নাম সীমান্ত ও দিগন্ত হিসেবেই উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া ‘মীর’ নামটি প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক বংশীয় পরিচয় বহন করে।

গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বের দেউলী ইউনিয়ন ভেঙে নতুন ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নটি গঠন করা হয়েছে। এই ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত মৌজাগুলো হলো—ভরিয়া (ভৈরা), মেঘাখর্দ্দ, আলমপুর, রহবল, সাওয়ালদহ, কৃষ্ণপুর, তালিবপুর ও বোয়ালমারী। মোট ৮টি মৌজা নিয়ে গঠিত এই নতুন ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যা ১৭ হাজার ৭৫৯ জন।

প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে নবগঠিত স্বর্ণগ্রাম, সীমান্ত ও দিগন্ত ইউনিয়ন, মোকামতলা পৌরসভা এবং শিবগঞ্জ পৌরসভার বর্ধিত অংশ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট মৌজাগুলো নিয়ে আরও পাঁচটি ইউনিয়ন পুনর্গঠন করা হয়েছে।

প্রশাসনিক ইউনিটের নামকরণে এমন পারিবারিক প্রভাবের বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, কোনো এলাকার নাম নির্ধারণে সেই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য বা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জড়ানো উচিত। কিন্তু এখানে স্রেফ ব্যক্তি বা পারিবারিক প্রভাব খাটানো হয়েছে কি না, তা উচ্চপর্যায়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নামকরণের পেছনে প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি ভূমিকা ছিল কি না কিংবা ইউনিয়নগুলোর নাম তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাম অনুসারে রাখা হয়েছে কি না এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ব্যক্তিগত নাম্বারে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব বলেন, এরকম একটি বিষয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে এবং ঘটনার কিছুটা সত্যতাও আছে। তবে আমার মনে হয় না এখানে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় নিজে সরাসরি অবগত আছেন। যদি তিনি জানতেন, এ কাজ উনি করতে দিতেন না বলেই আমার বিশ্বাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কাজ ইতিপূর্বে কখনো হয়েছে বলেও আমার জানা নেই। খবরটি শুনে আমি নিজেও খুবই চমৎকৃত হয়েছি।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রশাসনিক কাঠামোকে পারিবারিকীকরণের এই অভিনব ঘটনা আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন