ওপর থেকে দেখলে মনে হবে ভিয়েতনামের কোয়াং ট্রি প্রদেশের ভিন মক এক আটপৌরে ও শান্ত জনপদ। চারপাশের সবুজ আর শান্ত পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এই মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে এক রোমাঞ্চকর, হাড়হিম করা এবং একই সাথে অবিশ্বাস্য এক ইতিহাস। ষাটের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন বাহিনীর ভয়াবহ বোমাবর্ষণ থেকে বাঁচতে এই মাটির নিচেই আস্ত এক ‘সুড়ঙ্গ গ্রাম’ তৈরি করেছিলেন স্থানীয়রা। যেখানে অন্তত ৪০০ মানুষ টানা ছয় বছর সূর্যের আলো না দেখে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।
১৯৬৫ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত চলা ভিয়েতনাম যুদ্ধে কৌশলগত কারণে ভিন মক এলাকায় প্রায় ৯ হাজার টন বোমা ফেলা হয়েছিল। চারপাশ যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছিল, তখন প্রাণ বাঁচাতে গ্রামবাসী এক অভিনব ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তারা মাটির ৫০ থেকে ৭৫ ফুট গভীরে তৈরি করেন এক বিশাল সুড়ঙ্গপথ।
প্রায় দেড় মাইল দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গটি ছিল তৎকালীন সময়ের এক প্রকৌশল বিস্ময়। ভারী বোমার আঘাত ও কম্পন সইতে সুড়ঙ্গটি সোজা না বানিয়ে আঁকাবাঁকাভাবে তৈরি করা হয়। সুড়ঙ্গের ভেতর তৈরি করা হয়েছিল প্রতিটি পরিবারের থাকার জন্য ছোট ছোট কুঠুরি, পানির কূপ, মিটিং রুম এবং রান্নার জায়গা। মাটির নিচে রান্না করার সময় ধোঁয়া যাতে ওপরে মার্কিন বাহিনীর চোখে না পড়ে, সে জন্য তারা ব্যবহার করতেন বিশেষ ‘হোয়াং কাম’ চুলা, যা ধোঁয়াকে চারদিকে ছড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিত।
ভিন মক টানেলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি শুধু সাময়িক কোনো আশ্রয়কেন্দ্র ছিল না, এটি ছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ গ্রাম। বর্তমানে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত এই সুড়ঙ্গে গেলে দেখা মেলে সেই ঐতিহাসিক ‘ম্যাটারনিটি ওয়ার্ড’ বা প্রসূতি কক্ষের। মাটির নিচের স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার, তীব্র গরম আর শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মধ্যেও যুদ্ধের ওই দীর্ঘ সময়ে সেখানে অন্তত ১৭টি শিশু জন্ম নিয়েছিল।
দিনের আলোয় বোমার হাত থেকে বাঁচতে গ্রামবাসী সারাদিন মাটির নিচে কাটাতেন। আর রাতের আঁধারে যখন বোমাবর্ষণ কমত, তখন তারা বের হতেন চাষাবাদ বা সমুদ্র থেকে মাছ ধরার জন্য। এ যেন এক অকল্পনীয় ও অতিমানবীয় টিকে থাকার লড়াই।
ভিয়েতনামের যুদ্ধ ইতিহাসে ভিন মক টানেলকে একটি অলৌকিক অধ্যায় বলা চলে। বছরের পর বছর ধরে চলা ওই ভয়াবহ বোমাবর্ষণে পুরো এলাকা মাটির সাথে মিশে গেলেও, সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকা একজন মানুষেরও মৃত্যু হয়নি। নিখুঁত পরিকল্পনা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরেই তারা পরাস্ত করেছিল যমদূত সমতুল্য যুদ্ধকে।
আজকের ভিন মক ভিয়েতনামের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। যেখানে একসময় বোমার শব্দে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠত, সেখানে এখন শান্ত জনপদে রাস্তার পাশে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে পর্যটকেরা আড্ডা দেন, নুডলস বা স্যুপের স্বাদ নেন। অথচ তাদের পায়ের নিচেই সুড়ঙ্গের অন্ধকারে রয়ে গেছে মানব ইতিহাসের টিকে থাকার চরমতম সংগ্রামের নীরব সাক্ষী। যুদ্ধ মানুষকে কতটা চরম পরিস্থিতিতে নিয়ে যেতে পারে এবং মানুষ কীভাবে তার মুখোমুখি হতে পারে, ভিন মক টানেল আজীবন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে।