তুরাগ নদ থেকে গত দুই দিনে তিন তরুণের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী চরম উত্তেজনা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। একদিকে ভুক্তভোগী পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী ও যুবলীগ নেতার বক্তব্য এটিকে পুলিশ এবং প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মীদের পরিকল্পিত হামলা ও যৌথ অভিযানের মুখে পড়ে সলিলসমাধির ঘটনা বলে দাবি করছে; অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসন পুরো বিষয়টিকে ‘দুর্ঘটনা’ ও ‘গুজব’ বলে অভিহিত করেছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও স্থানীয় অনুসন্ধানের পাশাপাশি এই ঘটনায় ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সদস্য তৈয়্যবুর রহমানের এক বিস্ফোরক বক্তব্যে পুরো ঘটনার এক চাঞ্চল্যকর বিবরণ সামনে এসেছে।
তুরাগ নদীতে নিখোঁজ ও হামলার শিকার হওয়া ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সদস্য তৈয়্যবুর রহমান ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন,তুরাগ নদীতে আমরা ভয়াবহ ও পরিকল্পিত হামলার শিকার হয়েছি। আমরা সবাই মিলে ট্রলারে করে তুরাগ নদীতে শপথ নিয়েছিলাম। ট্রলারে শতাধিক নেতাকর্মী ছিল এবং মিরপুর এলাকায় আমাদের একটি মিছিল করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু স্থানীয় বিএনপির লোকজন জানতে পারে যে আমরা মিছিল করতে যাচ্ছি।
আমরা যখন ঘাটে আসি, তখনই বিএনপির নেতাকর্মী ও পুলিশ আমাদের ওপর একযোগে হামলা করে। পুলিশের সাথে বিএনপির নেতারা মিলে আমাদের মারধর ও টানা-হেঁচড়া করে। এই তাণ্ডবের মধ্যে আমাদের প্রায় সবার মোবাইল ফোন হারিয়ে গেছে। একপর্যায়ে কয়েকজন প্রাণ বাঁচাতে নদীতে লাফ দেয়। এদের মধ্যে তিনজনের মরদেহ পরে উদ্ধার হয়েছে। এখনও ৪ জনের কোনো খবর পাচ্ছি না। মোবাইল না থাকাতে প্রায় সবার সাথে সবার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি যারা শপথে ছিল সবার সাথে কন্টাক্ট করার। নিখোঁজ হওয়ার সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিবারিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ২২ জুন দুপুরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী দিয়াবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় একটি ঝটিকা মিছিল বের করেন। মিছিল শেষে বিকেলে মিরপুর বেড়িবাঁধ ঘাট থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করে তারা আশুলিয়া বাজার ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হন। নৌকার ভেতরে অবস্থানকালে তারা রাজনৈতিক স্লোগান ও শপথ নেন। দীর্ঘ সময় নদীতে তাদের এই অবস্থান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর একপর্যায়ে বাইরে জানাজানি হয়ে যায়।
নৌকাটি যখন আশুলিয়া বাজার ঘাটে এসে পৌঁছায়, তখন আশুলিয়া বাজার পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল এবং স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক কর্মী সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নিচ্ছিলেন। নৌকাটি ঘাটে ভিড়তেই প্রথম দফায় নেমে যাওয়া ৭-৮ জনকে আটকে ফেলা হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নৌকার মাঝিরা ঘাট থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র ধস্তাধস্তি ও হট্টগোল শুরু হয়। এই ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বেশ কয়েকজন নদীতে পড়ে যান। এদের মধ্যে সুমন, বিপ্লবসহ তিনজন সাঁতার না জানার কারণে পানিতে ডুবে মারা যান বলে দাবি করা হচ্ছে।
নিহত সুমনের খালু বাবু গণমাধ্যমকে জানান, ২২ তারিখ রাতে সুমনের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাই। পরে জানতে পারি, আওয়ামী লীগের মিছিল শেষে আশুলিয়া ঘাটে নামতে গেলে ধস্তাধস্তির মুখে অনেকে নদীতে পড়ে যায়। সে সাঁতার জানতো না। ২৩ তারিখ রাত থেকে খোঁজাখুঁজির পর ২৪ তারিখে দুইজনের লাশ পাওয়া যায়, যারা সুমনের সাথেই ছিল। পরে ২৫ তারিখে পুলিশ ফোন করে আশুলিয়া ব্রিজের কাছ থেকে সুমনের লাশ উদ্ধারের তথ্য জানায়।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠেছে যে, ঘটনার পর থেকে নিহতদের পরিবারগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। গ্রেফতার বা আইনি হয়রানির ভয়ে সুমনের বাবা গত দুই দিন ধরে পলাতক রয়েছেন। একইভাবে নিহত অপর তরুণ বিপ্লবের পরিবারও এলাকায় একাকী থাকার কারণে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এবং গত তিন দিন ধরে তাঁর বাবা-মায়ের কোনো খোঁজ মিলছে না। ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, পুলিশি ভীতির কারণে মূল ধারার গণমাধ্যমগুলো প্রথম দিকে পরিবারের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে পারেনি।
এদিকে, এই ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা ও তথ্য ছড়াতে শুরু করলে বাংলাদেশ পুলিশ সদরদপ্তর এবং আশুলিয়া ও দারুস সালাম থানা পুলিশ তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, তুরাগ নদে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সাত নেতাকর্মীর মরদেহ ভাসছে—এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব। পুলিশ সদরদপ্তর বিষয়টিকে সম্পূর্ণ গুজব বললেও স্থানীয় আশুলিয়া ও দারুস সালাম থানা পুলিশ নদী থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যরা সুমনকে শনাক্ত করেন। তবে পুলিশের দাবি অনুযায়ী, পরিবার প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের জানিয়েছে যে সুমন ২২ জুন বন্ধুদের সাথে পিকনিকে গিয়েছিলেন এবং সাঁতার না জানার কারণে ট্রলার থেকে পড়ে ডুবে যান।
যুবলীগ নেতার প্রত্যক্ষ বিবরণ এবং নিহতদের পরিবারের আতঙ্কের বিপরীতে পুলিশের এই ‘পিকনিক’ তত্ত্বের কারণে ঘটনাটি নিয়ে এখনো দেশজুড়ে চরম ধোঁয়াশা কাটেনি। এটি একটি স্বাভাবিক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক সংঘাত ও পরিকল্পিত হামলা লুকিয়ে ছিল, তা নিশ্চিত হতে জোর দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।