সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের চত্বর ও ভাস্কর্য অপসারণ!

ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ ও অসম্পূর্ণ ভাস্কর্যটি গত কয়েক দিন ধরে অপসারণ করা হচ্ছে। তবে ঠিক কার নির্দেশে,

ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ ও অসম্পূর্ণ ভাস্কর্যটি গত কয়েক দিন ধরে অপসারণ করা হচ্ছে। তবে ঠিক কার নির্দেশে, কোন সংস্থার উদ্যোগে এবং কী কারণে জাতীয় বীরের এই স্মৃতিচিহ্ন ভাঙা হচ্ছে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছে না জেলা প্রশাসন, পৌরসভা কিংবা সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এই ঘটনা নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক কর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

দেখা গেছে, ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সামনে শ্রমিকরা চত্বর ও ভাস্কর্যের অংশ ভাঙার কাজ করছেন। স্থানীয়রা জানান, বেশ কয়েক দিন ধরেই এই অপসারণের কাজ চলছে। তবে কে বা কারা এটি করাচ্ছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা দাবি করছেন, ওই স্থানে প্রায়ই ছোটখাটো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটায় পৌরসভার উদ্যোগে এটি অপসারণ করা হচ্ছে বলে তারা শুনেছেন। তবে ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রশাসক রথিন্দ্র নাথ রায় এ দাবি নাকচ করে বলেন, এ কাজটি কে করছে আমরা জানি না। পৌরসভার পক্ষ থেকে এটি করা হচ্ছে না। পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ আলী খানও এ বিষয়ে অন্ধকারে থাকার কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, এটা যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, তা জানা ছিল না। কারণ এটি অসম্পূর্ণ ছিল। জেলা প্রশাসন এ কাজ করছে না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এটি ওই স্থান থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সম্ভবত সড়ক ও জনপথ বিভাগ ও পৌরসভা সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে। তিনি আরও জানান, জেলা পুলিশ লাইন্সের সামনে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি নতুন প্রতিকৃতি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

কিন্তু জেলা প্রশাসকের এই অনুমানের বিপরীতে ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ভাস্কর্য ও চত্বরটি কারা অপসারণ করছে, তা তাঁর জানা নেই।

অন্যদিকে, জেলা পরিষদের প্রশাসক এম মাজিদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীরা দুই দফায় স্থাপনাটিতে ভাঙচুর চালিয়েছিল। পাশাপাশি এটি সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও সৃষ্টি করছিল। বিভিন্ন সভায় এটি সরানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তবে এখন কে সরাচ্ছে তা তিনি জানেন না।

জাতীয় বীরের স্মৃতি মুছে ফেলার এই তৎপরতায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শুধু ঝিনাইদহ নয়, সারা দেশের গর্ব। তাঁর স্মৃতিচিহ্ন অপসারণ করা হচ্ছে, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত একই স্থানে বা অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে হবে।

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার চাচা দেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন। আমাদের বা পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এভাবে চত্বরটি অপসারণ করা দুঃখজনক। আমরা মনে করি, ইতিহাস থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তিনি দ্রুত নতুন করে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানান।

জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ জানান, চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন গোলচত্বরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া জেলা বিএনপির নেতা আব্দুল মজিদ বিশ্বাস বলেন, বর্তমান স্থাপনাটি তৎকালীন জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যোগে নির্মাণ শুরু হলেও তা আর শেষ করা হয়নি। তবে যে কারণেই এটি সরানো হোক না কেন, অবিলম্বে নতুন করে একটি পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণ করা উচিত।

পৌরসভা সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কাজ শেষ না করেই প্রকল্পটি ফেলে রাখা হয়। পরবর্তীতে মেয়র ও প্রশাসক পরিবর্তন হলেও কাজ আর এগোয়নি। দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকায় চত্বরটি আগাছায় ঢেকে অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ছিল।

উল্লেখ্য, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে তিনি শহীদ হন এবং দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ লাভ করেন।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন