সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের ১০০ দিন পূর্ণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময়ে নির্বাচনি ইশতেহারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, হামে শিশুমৃত্যু, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রশাসনকে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, স্বল্প সময়ের মধ্যেই জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের মাসিক ভাতা, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেস বিতরণ, স্নাতক পর্যায়ে মেয়েদের বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ এবং খাল খনন কর্মসূচির মতো বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন বা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
গত ২৩ মে ময়মনসিংহে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সরকার জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করছে। কিন্তু একটি পক্ষ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করতে অপপ্রচার ও অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।”
তবে সরকারের এই সময়কালকে ঘিরে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আনু মুহাম্মদ বলেন, “সরকার এখনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের চিত্র দেখাতে পারেনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।”
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ে। সরকার শুরুতে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও গত ১৮ এপ্রিল সব ধরনের জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, শিল্প ও নিত্যপণ্যের বাজারে।
এদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি।
হামে শিশুমৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ
বর্তমান সরকারের সময় সবচেয়ে আলোচিত স্বাস্থ্য সংকট হয়ে উঠেছে হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭০ দিনে হামে মৃত্যু হয়েছে ৫২৮ শিশুর। বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতা ও চিকিৎসা সংকটকে দায়ী করলেও সরকার বলছে, পূর্ববর্তী সময়ের অব্যবস্থাপনার প্রভাব এখনো কাটেনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, ৯০ লাখ ডোজ হামের টিকা সংগ্রহসহ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে।
ঋণের চাপ ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ জিডিপির ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন নিয়ে এখনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা
সরকারের প্রথম ১০০ দিনে খুন, ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩৭ জন নারী, যার মধ্যে ৯১ জন শিশু।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এক অনুষ্ঠানে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে—এ বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই।”
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, “সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে।”
শিক্ষাঙ্গনে উত্তেজনা
চট্টগ্রাম সিটি কলেজকে কেন্দ্র করে ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘর্ষের জেরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও সামনে আসে। সর্বশেষ ডুয়েটে উপাচার্য নিয়োগ ইস্যুতে সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ১৫ জন।
রাজনৈতিক মূল্যায়ন
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “সরকার কিছু জনবান্ধব কাজ করেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি সংকট ও স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, “১০০ দিনে সরকারের কর্মকাণ্ডে ভবিষ্যতের একটি আভাস মিলেছে। সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আরও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।”
অন্যদিকে শামসুজ্জামান দুদু বলেন, “স্বল্প সময়ের মধ্যেই সরকার প্রত্যাশার বাইরে অনেক কাজ করেছে। সামনে আরও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছি।”