সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

তৃণমূলের বিদ্রোহ-ভাঙন ঠেকাতে দলে বড় পরিবর্তন আনলেন মমতা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পর নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও চরম ভাঙনের মুখে পড়েছে টানা তিনবার রাজ্য শাসন করা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পর নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও চরম ভাঙনের মুখে পড়েছে টানা তিনবার রাজ্য শাসন করা দল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)। নির্বাচনের এই ঐতিহাসিক ভরাডুবির পর দলের ভেতরের ক্ষোভ এখন প্রকাশ্য কোন্দলে রূপ নিয়েছে। উদ্ভূত এই নজিরবিহীন সংকট সামাল দিতে এবং দলে নিজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক ক্ষমতায় বড় ধরনের লাগাম টেনে ধরেছেন দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

তৃণমূলের ভেতরে চলমান এই তীব্র ক্ষোভ বা বিদ্রোহ সরাসরি দলনেত্রী মমতার বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি মূলত গড়ে উঠেছে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিতর্কিত কার্যপদ্ধতির বিরুদ্ধে। দল ভাঙন ও প্রবীণ নেতাদের দলত্যাগ রুখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তড়িঘড়ি করে দলের রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারণী স্তরে এক ঝাঁক পুরনো ও অনুগত নেতাকে ফিরিয়ে এনে বড় ধরনের রদবদল করেছেন। একই সাথে একযোগে ভেঙে দেওয়া হয়েছে দলের সব শাখা সংগঠন।

ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন সাংগঠনিক বিন্যাসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক’ পদে বহাল রাখা হলেও তাঁর একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি খর্ব করা হয়েছে। এখন থেকে অভিষেক আর এককভাবে কোনো নীতিগত বা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।

অভিষেকের ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট ও তাঁকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে রাজ্যসভার প্রভাবশালী সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেনকে দলের ‘জাতীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক’ হিসেবে মনোনীত করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর ফলে এখন থেকে যেকোনো সিদ্ধান্ত যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে গৃহীত হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বিপর্যয়ের পর আয়োজিত এক দলীয় সভায় নেতাদের জোর করে ভাইপো অভিষেকের ভূমিকার প্রশংসা করতে বলা হয়েছিল। এই পদক্ষেপে প্রবীণ ও শীর্ষ নেতাদের একটি বড় অংশ চরম ক্ষুব্ধ হন। তাঁরা মনে করেন, রাজ্যে তৃণমূলের অজনপ্রিয়তা এবং নির্বাচনী বিপর্যয়ের মূল কারণ অভিষেকের একনায়কতান্ত্রিক কার্যপদ্ধতি। ওই সভার পর থেকেই তৃণমূলের বিধায়ক ও নেতাদের মধ্যে ফাটল ধরতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে ব্যাপক বিদ্রোহে রূপ নেয়।

রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, নবনির্বাচিত বিধায়কদের একটি বড় অংশ এবং লোকসভার প্রায় ২০ জন সংসদ সদস্য ইতিমধ্যে মূল দল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বা বিকল্প পথ খোঁজার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক এই মুহূর্তে দলের বড় ধরণের ফাটল রুখতে এবং ক্ষুব্ধ জনপ্রতিনিধিদের শান্ত করতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবীণ ও অনুগতদের ফিরিয়ে এনে এই সাংগঠনিক ভারসাম্য রক্ষার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন।

দলের এই প্রজন্মগত ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে তৃণমূলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে। নতুন এই বিন্যাসে রাজ্য সভাপতির পদ থেকে সুব্রত বক্সীকে সরিয়ে প্রবীণ ও বিশ্বস্ত নেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে তৃণমূলের নতুন রাজ্য সভাপতি হিসেবে উন্নীত করা হয়েছে; আর সুব্রত বক্সীকে দেওয়া হয়েছে জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সহসভাপতির দায়িত্ব। এছাড়া অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট করতে প্রথমবারের মতো জাতীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক পদে যুক্ত করা হয়েছে রাজ্যসভার দুই প্রভাবশালী সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেনকে। একই সাথে দলের সব শাখাতেই নতুন মুখ নিয়ে আসার অংশ হিসেবে সাজদা আহমেদ, মমতা ঠাকুর, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় এবং স্বাতী খান্ডেকরকে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ তৃণমূল কংগ্রেসের সহসভাপতি নিযুক্ত করা হয়েছে। প্রবীণ ও নবীনের এই সমন্বয়ের মাধ্যমে মূলত ক্ষুব্ধ নেতাদের ক্ষোভ প্রশমন ও দলের ভেতর ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

এছাড়াও, তীব্র রদবদলের মাঝেও দলের অনুগত ও তরুণ সাংসদ সায়োনী ঘোষকে তৃণমূলের যুব শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারানোর পর দল টিকিয়ে রাখার এটাই মমতার শেষ চাল। একদিকে তিনি যেমন ভাইপো অভিষেকের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে দলের ভেতরে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার বার্তা দিলেন, অন্যদিকে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও সুব্রত বক্সীর মতো পুরনো চালিয়াতিদের ফ্রন্টলাইনে এনে ক্ষুব্ধ প্রবীণ নেতাদের মান ভাঙানোর চেষ্টা করলেন। তবে এই তড়িঘড়ি রদবদল তৃণমূলের আসন্ন ভাঙন কতটুকু ঠেকাতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন