রাজনীতি থেকে অবসরের জল্পনা পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর একটা সময়ে অবসরের কথা ভাবলেও, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই চিন্তা থেকে সরে এসেছেন তিনি। দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং দলের নেতাকর্মীদের এই সংকটে নেতৃত্ব দিতে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার ও খুব দ্রুত দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি এক একান্ত লিখিত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে মানুষের দুঃসময়ে তাঁদের পাশে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। ১৯৮১–তে আমি যখন সব হারিয়ে দেশে ফিরেছিলাম, তখন আওয়ামী লীগের কর্মীরাই ছিলেন আমার পরিবার। আজ সেই নেতা–কর্মীরা নির্যাতিত, আমার দেশের জনগণের জীবন আজ বিপর্যস্ত। আমি কীভাবে তাঁদের ছেড়ে বিশ্রামে যাই?
পূর্বে তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের দেওয়া এক বিবৃতির সূত্র ধরে রাজনীতি থেকে অবসরের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করেন, জয়ের সেই বক্তব্য তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত ছিল। তিনি নিজেও সব সময় নতুন ও তরুণদের হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত বদলের কারণ ব্যাখ্যা করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। গণতন্ত্র আক্রান্ত। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ করার আইন করা হয়েছে। আমার নেতাকর্মীরা কারাগারে, অনেকে ঘরছাড়া। সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন। নিরীহ শিশুরা টিকার অভাবে মারা যাচ্ছে, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে রাষ্ট্রকে ১৯৭১-এর পথ থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এমন একটা সময়ে আমি কীভাবে বলি, আমি বিশ্রামে যাচ্ছি? আমি ক্ষমতা চাই না, কিন্তু জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারি না।
শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন যে, বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা, উন্নত জীবনমান, অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং আওয়ামী লীগে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আগামী দিনের সাফল্য নিশ্চিত করার পরেই তিনি অবসর নেবেন।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, সেটি কোনো ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নয়। আওয়ামী লীগ কারও পারিবারিক সম্পত্তি নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক দল। কাউন্সিল (সম্মেলন)-এর মাধ্যমে, কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে এবং যোগ্যতা, ত্যাগ, সাহস ও আদর্শিক দৃঢ়তার ভিত্তিতেই আগামী দিনে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে।
দলের পদাধিকারী পরিবর্তন ও সংস্কারের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দল বর্তমানে একটা ‘প্রাকৃতিক শুদ্ধকরণ’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যারা শুধু ব্যক্তিগত সুবিধা ও ক্ষমতার আশায় দলে ছিলেন, তারা ইতিমধ্যে ভোল পাল্টে ফেলেছেন বা চুপ হয়ে গেছেন। এটি দলকে দুর্বল নয়, বরং খাঁটি করেছে।
আপাতত নেতৃত্বে বড়সড় কোনো আমূল বদলের সম্ভাবনা নেই ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে এনে নতুন সম্মেলনের মাধ্যমে দলকে সুসংগঠিত করা হবে। প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে সম্পদ হিসেবে রেখে, রাষ্ট্রযন্ত্রের জুলুম-নির্যাতন মোকাবিলা করে মাঠে টিকে থাকা মেধাবী ও দেশপ্রেমিক তরুণদের আগামী দিনে নেতৃত্বে নিয়ে আসার পরিকল্পনা ইতিমধ্যে করা হয়েছে।
সম্প্রতি দেওয়া তাঁর দ্রুত দেশে ফেরার ঘোষণার বাস্তবসম্মত দিক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সাথে বলেন, পাকিস্তানি শাসকরা পারেনি, সামরিক শাসকেরা পারেনি, খুনিরা পারেনি, ষড়যন্ত্রকারীরা পারেনি, আজকের বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারবে না।
তিনি আরও যোগ করেন, আমার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত। জনগণ বুঝতে পেরেছেন আওয়ামী লীগই তাঁদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। এই জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি ফিরব। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার গর্ব নিয়ে এবং দেশ পুনর্গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়েই আমি বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব।