সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

ককরোচ জনতা পার্টি ও পুঁচকে তেলাপোকাদের ওড়ার শক্তি

‘প্রজাপতি প্রজাপতি কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা?’ প্রজাপতি হলে সুরে সুরে প্রশ্ন করা যেত। কিন্তু তেলাপোকা প্রজাপতির মতো বর্ণিলও নয়, রোমান্টিকও নয়। তবু জানতে

‘প্রজাপতি প্রজাপতি কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা?’ প্রজাপতি হলে সুরে সুরে প্রশ্ন করা যেত। কিন্তু তেলাপোকা প্রজাপতির মতো বর্ণিলও নয়, রোমান্টিকও নয়। তবু জানতে মন চায়, ভারতের তেলাপোকাদের পাখায় ওড়ার এত শক্তি এলো কোথা থেকে? নিজেদের তেলাপোকা দাবি করা ভারতের তরুণদের দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) মাত্র ২৫ দিনে গোটা ভারতকেই নাড়িয়ে দিল কীভাবে?

রাজনীতিতে এই নবাগতদের শক্তি এখন এতটাই দৃশ্যমান যে, ভারতের প্রধান বিরোধী জোট ’ইন্ডিয়া’ও এখন সিজেপির পিছে হাঁটছে। গত শনিবার ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি যখন প্রথম প্রকাশ্য বিক্ষোভ করে, তার দুদিন পরই ’ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে সুর বদলাতে বাধ্য হন ঝানু রাজনীতিকরা। সিজেপির আন্দোলনকে উপেক্ষা না করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর দাবি ওঠে এবং বিরোধী জোটও এখন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছে।

রাজনীতিতে দশকের পর দশক পার করা অভিজ্ঞ নেতারা কেন এই পুঁচকে তেলাপোকাদের পিছে হাঁটছেন? তেলাপোকার পাখায় এত জোর এলো কোথা থেকে? মিলিয়ন ডলারের এই প্রশ্নের উত্তর জানা বিরোধী জোটের যেমন জরুরি, তার চেয়ে বেশি জরুরি ভারতের ক্ষমতাসীন শিবিরের। আসলে প্রচলিত ধারার রাজনীতি করা সবারই উত্তরটা জানা প্রয়োজন—তারা কেন যুগের পর যুগ রাজনীতি করেও তরুণদের মনের সাথে ‘কানেক্ট’ করতে পারছেন না?

এ প্রশ্নের কোনো শর্টকাট উত্তর নেই। অনেকগুলো ফ্যাক্টর মিলেই তবে পাখা মেলেছে এই তেলাপোকারা। প্রথম ফ্যাক্টর অবশ্যই বয়স। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ’আঠারো বছর বয়স’ কবিতাটি মনে করিয়ে দেয়—এ বয়স আপস করতে জানে না। তরুণরা পড়াশোনা শেষ করে বুক ভরা স্বপ্ন আর চোখ ভরা আশা নিয়ে মাঠে নেমে যখন দেখে চারপাশে শুধু বেকারত্ব আর হতাশা, যখন দেখে তাদের চোখের সামনেই স্বপ্নের দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের কাছে পুরো সিস্টেমটাই বেঠিক লাগে।

এই যে বুকের ভেতর ঝড় নিয়ে তড়পাতে থাকা অনেকগুলো মানুষ যখন একত্রিত হয়, তখন সেই ঝড় সাইক্লোন হয়ে যায়। ভারতের অভিজিৎ দীপক তেমন তড়পাতে থাকা তরুণদের একসাথে করতে পেরেছেন; এটাই তার কৃতিত্ব। ককরোচ জনতা পার্টির ক্ষোভ নিছক কোনো সরকারের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো সিস্টেমের বিরুদ্ধে। তরুণদের অভিযোগ, এই সিস্টেম তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে না। প্রচলিত রাজনীতিতে তাদের জন্য কোনো ‘স্পেস’ নেই।

সিজেপির এই অবিশ্বাস্য উত্থান থেকে আসলে বিশ্বের সব দেশেরই শেখার আছে। কারণ ক্ষোভের আগুনে প্রচলিত সিস্টেমকে ভেঙে তছনছ করার উদাহরণ পেতে দূর ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে হয় না; ঘরের কাছে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা নেপালে তরুণরা তা দেখিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের ককরোচ পার্টির আন্দোলনের এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। বাংলাদেশে আন্দোলন গতি পেয়েছিল এক সংবাদ সম্মেলনে তরুণদের ‘রাজকার’ শব্দটির সাথে তুলনা করার পর। আর ভারতে আন্দোলনের জন্ম হলো যখন খোদ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে তরুণদের কাউকে কাউকে ‘তেলাপোকা’ বলে তুচ্ছ করলেন। ‘ম্যায় হু ককরোচ’ (আমিই তেলাপোকা) স্লোগান দিয়ে পরদিনই অনলাইনে তৈরি হয়ে গেল ককরোচ জনতা পার্টি।

বাংলাদেশে আন্দোলন শুরু হয়েছিল চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে, আর সিজেপির প্রথম প্রকাশ্য বিক্ষোভ হলো নিট (NEET) পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষায় নানাবিধ সংকটের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে। তবে সমস্যাটা নিছক শিক্ষামন্ত্রীর নয়, এটা সিস্টেমের সংকট। ভারতে শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের প্রায় ২৯ শতাংশই আজ বেকার। আর এই ‘অলস বেকারদের’ই ডাক দিয়েছে তেলাপোকাদের দল।

একযুগ ধরে বিজেপি সরকার ভারত শাসন করছে। নরেন্দ্র মোদী যখন আরও শক্তি সঞ্চয় করছেন, তখন তেলাপোকাদের এই উত্থান বিজেপি বিরোধী শিবিরে আশার সঞ্চার করেছে। তাই তো বিরোধী জোট ’ইন্ডিয়া’ তাদের সুরে সুর মেলাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ বা নেপালের মতো ছোট দেশের ক্ষমতা কাঠামোর চেয়ে ভারতের ক্ষমতা কাঠামো অনেক বড় এবং জটিল। দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলনের উত্তাপ অরুণাচলে পৌঁছাতে সবগ্রাসী সুনামি লাগে।

তবে আন্দোলনের পরবর্তী শঙ্কাটা আরও বড়। নেপালের বিপ্লবীরা নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই সেখানে হতাশা ভর করেছে। আর বাংলাদেশের তরুণরা তো নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতার অংশীদার হয়ে নানা বিতর্কে জড়িয়ে আন্দোলনের মূল চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। উপরন্তু, বাংলাদেশের আন্দোলনের পর এখন খোদ অংশীজনরাই স্বীকার করছেন যে, তরুণদের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ‘ডিপ স্টেট’ পেছন থেকে একটি ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বা নিখুঁত নকশার মাধ্যমে আন্দোলন পরিচালনা করেছিল।

ভারতের তেলাপোকাদের ওড়ার পেছনেও তেমন কোনো ডিপ স্টেটের কৌশল বা অদৃশ্য হাত আছে কিনা, কে জানে! তেলাপোকারা পাখায় পাওয়া শক্তিতে উড়ে উড়ে ভারতের ক্ষমতা কাঠামোয় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে, নাকি তাদের ক্ষেত্রেও ‘পিপীলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে’ প্রবাদটিই সত্য হবে—তা জানার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন