ওমান উপকূলের কাছে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলায় তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই বন্ধু রাষ্ট্র ভারত ও আমেরিকার মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এই প্রাণহানির ঘটনায় নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে চরম ক্ষোভ ও কড়া প্রতিবাদ জানানো হলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের কঠোর সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানে অনড় রয়েছে।
সংঘাতপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর প্রবেশদ্বারে ওমান উপকূলের কাছে পালাউয়ের পতাকাবাহী ‘এমটি সেত্তেবেলো’ নামের একটি তেল ট্যাঙ্কারে মার্কিন বাহিনী হামলা চালালে তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হন। এর পরপরই একই এলাকায় ২০ জন ভারতীয় নাবিকসহ আরও একটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়।
এই জোড়া হামলার ঘটনার পর চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় নয়াদিল্লি। চলতি সপ্তাহে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স জেসন মিকসকে দুই দফায় তলব করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র প্রতিবাদ ও কৈফিয়ত দাবি করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে ফোন করে এই প্রাণহানির ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) জয়শঙ্কর লেখেন, বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর এই ধরনের প্রাণঘাতী সামরিক পদক্ষেপ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
তবে ভারতের এই তীব্র প্রতিবাদের জবাবে মার্কিন বিচার বিভাগ একটি কড়া বিবৃতি জারি করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সংঘাতপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের অবরোধ লঙ্ঘন ওয়াশিংটন মেনে নেবে না। বিবৃতিতে বলা হয়, ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা বজায় রাখার স্বার্থে মার্কিন বাহিনীর সব নির্দেশ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে অবিলম্বে মেনে চলতে হবে। ইরান থেকে অবৈধ তেল পরিবহন বা মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ ভাঙার যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালী ছেড়ে যাওয়া ভারতীয় জাহাজগুলোর ওপর ইরান ড্রোন হামলা চালিয়েছিল, যা মার্কিন বাহিনী সফলভাবে প্রতিহত ও ব্যর্থ করে দেয়।
মার্কিন প্রশাসনের এমন অসংবেদনশীল ও কঠোর অবস্থানের কারণে ভারতের রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের লোকসভার কংগ্রেস সাংসদ ও সাবেক কূটনীতিক শশী থারুর গভীর বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, নিরীহ ভারতীয়দের মৃত্যুর ঘটনায় আমেরিকার অফিশিয়াল বিবৃতিতে বিন্দুমাত্র সমবেদনা বা দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি, যা একটি বন্ধু রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনোভাবেই আশা করা যায় না। বেসামরিক নাবিকদের হত্যা করার জন্য সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র না ছুড়ে, অন্য কোনো উপায়ে বা জাহাজের দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা অচল করে দিয়েও কি জাহাজটিকে থামানো যেত না?
হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন এই সামরিক তৎপরতা এবং ভারতের অনমনীয় প্রতিবাদ আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে কেমন প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।