‘বাবা মন্ত্রী বলে ব্যবসার চাপ বেশি’ পদত্যাগপত্রে এমন সৎ স্বীকারোক্তি দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন নবনিযুক্ত পরিচালক মীর শাকরুল আলম সীমান্ত। তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পুত্র।
গতকাল রোববার (৭ জুন) বিসিবির পরিচালক পদে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরদিনই, অর্থাৎ আজ সোমবার (৮ জুন) তিনি এই আকস্মিক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। বোর্ডের ইতিহাসে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কোনো পরিচালকের এভাবে পদ ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা এবং পদত্যাগপত্রে দেওয়া এই কারণকে বিসিবির ইতিহাসে ‘বিরল সৎ স্বীকারোক্তি’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা।
ক্রীড়াঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে, মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে কিংবা ‘বাপের দোয়ায়’ বোর্ডে প্রভাবশালী এই চেয়ারটি পেয়েছিলেন মীর শাকরুল আলম সীমান্ত। তবে বোর্ডে বসার ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই ‘বাপের ব্যবসার ব্যস্ততা’র অজুহাত দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করলেন।
অনেকে রসিকতা করে বলছেন, বৃত্তটা যেন চটজলদি সম্পূর্ণ হলো। তবে ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, কারণ যাই হোক না কেন পরিচয় বা ক্ষমতার জোরে বোর্ডে এসে পরক্ষণেই নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে সরে দাঁড়ানোর এই সিদ্ধান্তটি একই সাথে সৎ এবং সাহসী। বিশেষ করে বিসিবির মতো বোর্ডে, যেখানে বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির চাদরে ঢাকা ‘ড্যাডিস বোর্ড’ বা পারিবারিক সংস্কৃতির আধিপত্য দেখা গেছে, সেখানে মীর শাকরুল আলমের এই দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল।
প্রতিমন্ত্রী পুত্রের এই সাহসী পদত্যাগের পর এখন দেশের ক্রিকেটপ্রেমী ও সাধারণ ক্রীড়া সংগঠকদের মনে একটাই বড় প্রশ্ন বোর্ডের বাকি পরিচালকরা কি এই আয়নায় নিজেদের মুখ দেখবেন?
বিসিবিতে বর্তমানে এমন অনেক পরিচালক রয়েছেন, যাদের নামের প্রথম লাইনে ক্রিকেটের কোনো অতীত ইতিহাস নেই, নেই মাঠের ক্রিকেটের সাথে ন্যূনতম সংযোগ। তাদের একমাত্র পরিচয় কারো বাবার বড় রাজনৈতিক পদবি, কারো ভাইয়ের ক্ষমতার প্রভাব, কিংবা কারো মামার জোর। সীমান্তের এই তাৎক্ষণিক বিদায় ক্রিকেট অঙ্গনে একটি বড় ধাক্কা দিয়ে গেল। প্রশ্ন উঠেছে, ক্রিকেটীয় ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া শুধু প্রভাব খাটিয়ে যারা বছরের পর বছর পদ আঁকড়ে আছেন, তারাও কি সীমান্তের দেখানো পথ ধরে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াবেন?
দেশের ক্রিকেট অনুরাগীদের দীর্ঘদিনের দাবি, রাজনৈতিক পুর্নবাসন কেন্দ্র কিংবা পারিবারিক প্রভাবের বলয় থেকে মুক্ত হোক বিসিবি। ২২ গজের ক্রিকেটটা অন্তত এই দাবিটুকু রাখে যে, সেখানে শুধু ক্রিকেট মস্তিষ্ক এবং সত্যিকারের নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠকদের জায়গা হবে।
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী পুত্রের এই পদত্যাগ বিসিবির অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং শুদ্ধি অভিযানের একটি প্রতীকী সূচনা হতে পারে বলে মনে করছেন দেশের ক্রীড়া বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, ক্রিকেট বোর্ড এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সত্যিকারের ক্রিকেটবান্ধব ও পেশাদার সংগঠকদের ফিরিয়ে আনতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয় কি না।