সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত বন্ধে এবং উত্তেজনা প্রশমনে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে। চুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যতম

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত বন্ধে এবং উত্তেজনা প্রশমনে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে। চুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ আবার আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও নৌ অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হবে।

শনিবার (১৩ জুন) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জানান, চলমান আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো, সামরিক উত্তেজনা কমানো এবং ধাপে ধাপে অবরোধ প্রত্যাহার। তবে ইরানের বহুল বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই ধাপে হচ্ছে না, এটি পরবর্তী ধাপে শুরু হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও এই আলোচনার অগ্রগতির কথা স্বীকার করেছেন। তবে ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই সমঝোতা কোনো মৌখিক প্রতিশ্রুতি বা বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে হচ্ছে না। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরান চুক্তির শর্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর করছে, তার ওপরই নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সুবিধা। ইরানকে শুরুতেই কোনো নগদ অর্থ দেওয়া হবে না, বরং তাদের পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা সরানো হবে এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ পর্যায়ক্রমে মুক্ত করা হতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার পর ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হয়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের মূল ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ করে দেয়। এপ্রিল মাসে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও চলতি সপ্তাহেও দুই দফা সামরিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

এই উত্তেজনার মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত একটি সামরিক হামলা স্থগিত করেছেন, কারণ দুই দেশ সমঝোতার খুব কাছাকাছি রয়েছে। তবে ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ১৪ দফার খসড়া চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প বলেন, প্রকাশিত শর্তগুলোর সঙ্গে প্রকৃত আলোচনার মিল নেই।

এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, তাঁর দেশ এই সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এবং দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউর বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।

চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ৬০ দিনের একটি নতুন আলোচনা পর্ব শুরু হবে। সেখানে মূল আলোচ্য বিষয় হবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির এই মূল উপাদান ইরানের ভেতরেই ধ্বংস করতে হবে অথবা সরিয়ে নিতে হবে। এছাড়া চুক্তির খসড়ায় লেবাননের হিজবুল্লাহসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইরান-সমর্থিত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে তেহরানের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা বন্ধের আহ্বানও রাখা হয়েছে।

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই জলপথ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য স্বস্তির খবর হলেও আরাগচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা আগের মতো থাকবে না।

প্রণালি বন্ধ করার পর থেকে ইরান সেখানে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে নির্দিষ্ট ফি দাবি করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো সব আন্তর্জাতিক জাহাজের জন্য এই পথ সম্পূর্ণ বাধাহীন ও উন্মুক্ত থাকতে হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, এই সমঝোতা স্মারকে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত কমানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এই আলোচনার বাইরে থাকা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, উত্তর ইসরায়েলে হামলা অব্যাহত থাকলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান চালানো হবে। ফলে চুক্তিটি চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন