সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

ফিটনেস ক্লাবের আড়ালে দেশজুড়ে উগ্রবাদী ‘ফাতাহ’ নেটওয়ার্ক

মার্শাল আর্ট, কমব্যাট ট্রেইনিং এবং আত্মরক্ষার (সেলফ-ডিফেন্স) ছদ্মবেশে দেশের যুবসমাজকে উগ্রবাদে দীক্ষিত করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের তথ্য ফাঁস হয়েছে। ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (FCS) নামের একটি

মার্শাল আর্ট, কমব্যাট ট্রেইনিং এবং আত্মরক্ষার (সেলফ-ডিফেন্স) ছদ্মবেশে দেশের যুবসমাজকে উগ্রবাদে দীক্ষিত করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের তথ্য ফাঁস হয়েছে। ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (FCS) নামের একটি আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জাল বিস্তার করেছে এই চক্র।

ইতিমধ্যেই রাজধানীর রমনা পার্ক এলাকা থেকে গোপন প্রশিক্ষণ চলাকালে ২ জন এবং পরবর্তীতে তাদের ছাড়াতে এসে ডিবি পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন এই চক্রের মূল হোতা ও প্রতিষ্ঠাতা উস্তায শাহ্ আমানত সাবির।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’-এর প্রতিষ্ঠাতা শাহ্ আমানত সাবিরের বাবা খুলনা অঞ্চলের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একজন চিহ্নিত শীর্ষ নেতা। বাবার রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক উগ্রপন্থী মিলিশিয়াদের রণকৌশল অনুসরণ করে ছেলে এই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শাহ্ আমানত সাবির পূর্বে ছদ্মবেশে সরকারের কিছু সংস্থার সাথেও মার্শাল আর্ট ট্রেইনিংয়ে যুক্ত ছিলেন এবং জাতীয়ভাবে মেডেলও পেয়েছেন। এই পরিচিতিকে তিনি আইনি নজরদারি এড়ানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন।

বাইরে একে সাধারণ জিম বা ফিটনেস সেন্টার বলা হলেও, ভেতরে এর কার্যক্রম হুবহু নিষিদ্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর আদলে পরিচালিত হতো। এরা প্রতি মাসে ৮৫০ থেকে ১২০০ টাকা ফি নিত। ঢালাওভাবে সবাইকে ভর্তি না করে সুনির্দিষ্ট অনলাইন ফরমের মাধ্যমে কঠোর স্ক্রিনিং করা হতো। কেবল নিজেদের সমমনা ‘দীনি ভাই’দেরই এই প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা হতো।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এরা নিয়মিত স্থান পরিবর্তন করত। অনুসন্ধানে এদের সুনির্দিষ্ট কিছু ট্রেইনিং জোনের সন্ধান মিলেছে।

খুলনা মূল কেন্দ্র, খুলনা বড় মাঠে প্রতি শুক্র ও শনিবার ভোরে নির্জনতায় চলত প্রাথমিক রিক্রুটমেন্ট ও শারীরিক পরীক্ষা। যশোর পৌর পার্কের ভেতরে ছদ্মবেশে চলত সাংগঠনিক কার্যক্রম। অভয়নগর নওয়াপাড়া সরকারি কলেজ মাঠে নদী বন্দর এলাকাকে কেন্দ্র করে চলত তরুণদের মগজধোলাই। খুলনা থেকে নদীপথে এখানে যাতায়াত সহজ।

অভয়নগর ও সিদ্ধিপাশা সংলগ্ন প্রত্যন্ত, বনে ঘেরা নদী তীরবর্তী এলাকায় প্রতি ২/৩ মাস পর পর ৩ থেকে ৫ দিনের নিবিড় সামরিক কায়দায় ‘আউটডোর কমব্যাট এবং সারভাইভাল’ ক্যাম্প করা হতো। দুর্গম হওয়ায় পরমপন্থিরা একে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করত।

রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকার নিরিবিলি ফ্ল্যাট এবং সাভার-গাজীপুরের নির্জন রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে চলত উচ্চতর মগজধোলাই ও গেরিলা যুদ্ধের তাত্ত্বিক পাঠ।

গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’-এর সাথে পাকিস্তান ও তুরস্কের উগ্রপন্থী বিভিন্ন মিলিশিয়া নেটওয়ার্কের পরোক্ষ সংযোগ বা অর্থায়নের লিংক রয়েছে। শুধু তাই নয়, পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও ইসলামিক মূল্যবোধের আড়ালে শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের আওতাভুক্ত করা হচ্ছিল। যা ভবিষ্যতে এক বিশাল ‘নারী উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক’ তৈরির সুদূরপ্রসারী ইঙ্গিত দেয়।

গতকাল রোববার (৫ জুলাই) ঢাকায় ২ প্রশিক্ষক আটকের পর রাতে মূল হোতা শাহ্ আমানত সাবিরকেও আইনের আওতায় আনা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ইতিমধ্যেই বিপুল পরিমাণ উগ্রবাদী বই, সামরিক কায়দার পিটি-প্যারেডের ভিডিও এবং ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করেছে। এই দেশবিরোধী আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কের মূলোৎপাটনে বর্তমানে সারাদেশে গোয়েন্দা নজরদারি ও চিরুনি অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন