টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও উজানের পানির তোড়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এক ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় লাখো মানুষ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের তীব্র সংকটে পড়েছেন। চারদিকে থই থই পানির এই সর্বগ্রাসী রূপের মাঝে মানুষ হন্যে হয়ে খুঁজছেন একটুকরো শুকনো মাটি আর একটু নিরাপদ আশ্রয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গত রবিবারের (১২ জুলাই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ এই সাতটি জেলার ৫৮টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ এবং পানিবন্দি রয়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার। এখন পর্যন্ত বন্যায় ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বন্যার পানিতে ডুবে রয়েছে। উপজেলার অন্তত চার লাখ বাসিন্দা বর্তমানে পানিবন্দি। বন্যা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা ফুটিয়ে তুলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি হৃদয়বিদারক ভিডিও।
গত শুক্রবার উপজেলার জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়নে মারা যান অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফোরকান (৬০)। তাঁর ঘর-উঠান ও পারিবারিক কবরস্থান কোমরসমান পানিতে ডুবে থাকায় নিজ বাড়িতে লাশের গোসল বা দাফন কোনোটিই করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে এলাকাবাসী কলাগাছের তৈরি একটি ভেলায় করে তাঁর মরদেহ প্রায় ৩০০ মিটার ভাসিয়ে নিয়ে যান। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে দুই কিলোমিটার দূরে দস্তিদারহাটে নিয়ে লাশের গোসল ও কাফনের প্রক্রিয়া শেষ করা হয়। পরে রাত ১০টার দিকে ফকির মুড়া ঈদগাহ এলাকায় জানাজা শেষে একটি পাহাড়ের খাস জায়গায় তাঁকে দাফন করা হয়।
নিহতের ছেলে রাসেল উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, দাদা-দাদির পাশে কবর দেওয়ার বাবার শেষ ইচ্ছাটা বন্যার কারণে আমরা পূরণ করতে পারলাম না। জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মহসিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নে ঘটেছে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। আলতাব আলী চৌধুরী জামে মসজিদসংলগ্ন কবরস্থানে সাঙ্গু নদীর বন্যার পানি ঢুকে তীব্র স্রোতে একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনটি পুরোনো লাশ কবর থেকে ভেসে গিয়ে পাশের ঝোপঝাড়ে আটকে পড়ে। পরে স্থানীয়রা মরদেহগুলো উদ্ধার করে অন্য একটি নিরাপদ কবরস্থানে পুনরায় দাফনের ব্যবস্থা করেন। সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে প্রবল বন্যা প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ। গত শনিবার সাতকানিয়া পৌরসভার দক্ষিণ রূপকানিয়া এলাকায় পরিবারের অগোচরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পানিতে ডুবে মারা যায় দুই বছরের শিশু ইসমাইল হোসেন। একই দিন বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নেও বাড়ির সামনে খেলতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যায় আরও দুই শিশু। মরদেহ দাফনের জায়গা না পেয়ে পরে উঁচু এলাকার এক পুকুরপাড়ে তাদের কবর দেওয়া হয়।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাত জেলায় ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ অবস্থান করছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম জেলায় ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২১ হাজার ৯০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারিভাবে এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে দুর্গত এলাকায় চাল, নগদ অর্থ, শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক দুর্গম এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি।