চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দেশের অন্যতম বহুল আলোচিত ও মেগা প্রকল্প ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ (সিইআইজেড)-এর আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছে সোমবার (২৭ জুলাই)। নানা চড়াই-উৎরাই আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচন করবেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্যসহ চীন ও বাংলাদেশ সরকারের উর্ধ্বতন নীতিনির্ধারকেরা এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে অংশ নেবেন।
আজকের ঐতিহাসিক দিনে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক সূচনা ছাড়াও অনুষ্ঠিত হবে গুরুত্বপূর্ণ সাব-লিজ চুক্তি স্বাক্ষর, সিইআইজেডের অফিসিয়াল স্লোগান উন্মোচন, বিনিয়োগকারীদের জন্য অতি কাঙ্ক্ষিত ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’-এর উদ্বোধন এবং স্মারক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।
কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই বিশাল অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে আলোচনা চলছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। ২০১৪ সালে চুক্তি স্বাক্ষর এবং ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও উন্নয়ন সহযোগী নির্বাচন ও চুক্তি সংক্রান্ত জটিলতায় দীর্ঘদিন স্থবির হয়ে পড়েছিল এর কার্যক্রম।
অবশেষে গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে স্থবিরতার বরফ গলে।
প্রকল্পের মোট বাজেট ৪,১৮৯ কোটি টাকা। চীনের এক্সিম ব্যাংকের বায়ার্স ক্রেডিট সুবিধার আওতায় ২,৪৬৭ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ এবং সরকারি তহবিল থেকে ১,৭২২ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন সময়সীমা ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
কর্ণফুলী টানেল (বঙ্গবন্ধু টানেল), চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ট্রায়াঙ্গেল ভৌগোলিক অবস্থানে থাকায় সিইআইজেড হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম টেকসই ও আধুনিক লজিস্টিক হাব।
২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার ডেডিকেটেড বহুমুখী জেটি। ১,২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক রোড এবং ১,১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান ট্রাঙ্ক রোড। ২৫ এমএলডি ক্ষমতার সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি), ৪.২৪ এমএমসিএফডি সক্ষমতার গ্যাস স্টেশন, দুটি ৩৩/১১ কেভি বিদ্যুৎ সাবস্টেশন এবং দৈনিক ৬০ টন ক্ষমতার আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র।
বেজার হিসাব অনুযায়ী, এই অঞ্চলটি পূর্ণাঙ্গ চালু হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে তৈরি হবে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। অন্তত ১ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝেও বইছে উৎসবের আমেজ। আনোয়ারা উপজেলার বৈরব ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, এই শিল্পাঞ্চল আমাদের এলাকার চেহারা বদলে দেবে। আমরা চাই স্থানীয় বেকার তরুণদের যেন এখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দীন এ বিষয়ে বলেন, উৎপাদন বাড়ানো, নতুন ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা এবং বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। আনোয়ারা চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গেম-চেঞ্জার হতে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিনের শঙ্কা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে আজ থেকেই যাত্রা শুরু হলো দক্ষিণ চট্টগ্রামের স্বপ্নের এই নতুন অর্থনৈতিক দিগন্তের।