ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী কারখানায় নতুন করে নাশকতামূলক হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। তবে সরাসরি ক্রেমলিন বা রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকে (জিআরইউ) অভিযুক্ত করার পথ বন্ধ রাখতে তারা স্থানীয় অপরাধী চক্রকে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে সম্প্রতি এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, মূল হামলা চালানোর পূর্বে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া কতটা কঠোর হতে পারে তা পরীক্ষা করে দেখাই মস্কোর প্রধান উদ্দেশ্য। হামলাগুলো এমন সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে যাতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা সংক্রান্ত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ৫ নম্বর ধারা কার্যকরের মতো স্পষ্ট কোনো পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জিআরইউ-এর এজেন্টরা এখন সরাসরি অন্য দেশে গিয়ে হামলা চালানো কমিয়ে দিয়েছে। তারা প্রধানত বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ ‘টেলিগ্রাম’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অপরাধী চক্রের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখছে। পরবর্তীতে এসব মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে মূল কাজের জন্য স্থানিয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়। বিনিময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে গোপন অর্থ পরিশোধ করা হয়, ফলে মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মীরা প্রায়শই জানতে পারেন না যে তারা বস্তুত রাশিয়ার হয়ে কাজ করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ন্যাটোভুক্ত ও ইউক্রেনকে সহায়তা প্রদানকারী দেশগুলোতে একাধিক রহস্যজনক নাশকতার ঘটনা ঘটেছে।
তাল্লিনভিত্তিক ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘মিলরেম রোবোটিকস’-এ অগ্নিয়াংশের অভিযোগে লাটভিয়ার তিন নাগরিককে আটক করা হয়েছে। গত ১০ আগস্ট ইউক্রেনের সামরিক চাহিদার ১৫৫ মিলিমিটার কামানের গোলা প্রস্তুতকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘এমকোর’-এর একটি কারখানায় ট্রাকে অগ্নিকাণ্ড ও পরবর্তীতে বিস্ফোরণ ঘটে। রোমের উপকণ্ঠে কেএনডিএস অ্যামো পরিচালিত একটি গোলাবারুদ কারখানার গানপাউডার প্রসেসিং ইউনিটে রহস্যজনক আগুন ও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। বছরের শুরুর দিকে ড্রোন ও সামরিক যন্ত্রাংশ তৈরি করা কারখানাগুলোতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যার একাধিক ঘটনায় ইতিমধ্যে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আনা হয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্লেষণ অনুসারে, রাশিয়ার এই হাইব্রিড যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য শুধু অস্ত্র সরবরাহ ব্যাহত করা নয়, বরং ন্যাটো জোটের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন বৃদ্ধি করা। পোল্যান্ড ও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো কঠোর ব্যবস্থার পক্ষে সোচ্চার হলেও, জার্মানি ও ইতালির মতো পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো পরিস্থিতি জটিল হওয়ার ভয়ে সরাসরি কোনো দেশকে দায়ী করতে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে রাশিয়ার এসব কর্মকাণ্ডকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অভিহিত করে বলেন, জোট তার সদস্যদের সুরক্ষায় যেকোনো হাইব্রিড ও প্রক্সি হুমকি মোকাবিলায় সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে। তবে শীতল যুদ্ধকালীন যে যোগাযোগের মাধ্যমগুলো খোলা ছিল, তা বন্ধ হওয়ায় ইউরোপে এই ধরনের গোপন হামলা দীর্ঘমেয়াদী বড় কোনো সংঘাতের পূর্বাভাস কি না তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।