রাজনীতির মাঠে ঝড় বয়ে গেছে, পুড়েছে আজীবনের অর্জন—স্মারক আর ট্রফি। ৫ আগস্টের সেই উত্তাল দিনে নড়াইলে নিজের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় যখন মাশরাফি বিন মুর্তজার বাবা গোলাম মর্তুজা অভিমানে বলে ওঠেন, ‘ছেলে বলেছে, আমি মারা গেলে লাশটা নড়াইলে নিও না’ তখন দেশজুড়ে তৈরি হয় এক বিষাদময় আবহ। কিন্তু বাবার সেই কঠিন মন্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন খোদ মাশরাফি। বুকভরা কষ্ট থাকলেও নিজের জন্মমাটি আর মানুষের প্রতি ঘৃণা নয়, বরং অগাধ ভালোবাসা আর ক্ষমার বার্তা দিয়েছেন নড়াইলের এই ‘বরপুত্র’।
বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় মাশরাফি যে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন, তা তার কণ্ঠেই স্পষ্ট। তবে সেই কষ্ট কোনো প্রতিহিংসার নয়, বরং এক গভীর অভিমানের। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাশরাফি বলেন, “যশোর বা সাতক্ষীরার মানুষ এসে তো আমার বাড়ি ভাঙেনি। আমার নড়াইলের মানুষই কোথাও না কোথাও থেকে উঠে এসে এটা করেছে। তাদের জন্য কত কী করলাম, তারা আমাকে এভাবে প্রতিদান দিল!”
এত কিছুর পরেও নড়াইলবাসীকে পর করে দিতে পারেননি তিনি। তিনি বিশ্বাস করেন, যারা এই কাজ করেছে তারাও এই মাটিরই সন্তান। তাই কোনো মামলা বা আইনি লড়াই নয়, বরং সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।
মাশরাফির বাবা গোলাম মর্তুজা ছেলের নিরাপত্তা আর বর্তমান মানবেতর পরিস্থিতি দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। একজন বাবার কাছে সন্তানের জীবনের নিরাপত্তা এবং সম্মানই সব। কিন্তু মাশরাফি জানেন, রাজনীতি কিংবা জনসেবায় উত্থান-পতন থাকেই। বাবার কথার বিপরীতে তিনি পরোক্ষভাবে এটাই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, নড়াইল তার অস্তিত্বের অংশ। প্রতিকূল সময়েও তিনি নড়াইল বা দেশের মানুষের প্রতি বিমুখ হতে চান না।
৫ আগস্টের পর থেকে মাশরাফি ও তার পরিবার অনেকটা আড়ালে এবং কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তবে ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মতে, এই খারাপ দিন সবসময় থাকবে না। মাশরাফি বিন মুর্তজা মানেই লড়াই করে ফিরে আসা। ক্রিকেট মাঠে যেমন খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তুলেছেন। রাজনীতির এই কঠিন পিচেও তিনি ধৈর্য আর সাহসের পরিচয় দিচ্ছেন।
মাশরাফি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি কোটি মানুষের আবেগ। নড়াইলের মানুষের সুখে-দুঃখে তিনি যেভাবে অতীতে পাশে ছিলেন, আগামীতেও সেভাবেই থাকতে চান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আজ হয়তো কেউ কেউ অখুশি হয়ে এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের ত্যাগ আর ভালোবাসার মূল্যায়ন একদিন মানুষ ঠিকই করবে। দেশের মানুষের জন্য কাজ করার যে মানসিকতা তার রয়েছে। তা তাকে আবারও জনগণের কাতারে ফিরিয়ে আনবে এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।
মাশরাফি বিশ্বাস করেন, নড়াইল তার ঘর, আর ঘরের মানুষ ভুল করলে বড় ভাই বা অভিভাবক হিসেবে ক্ষমা করে দেওয়াই তার ধর্ম। বিষাদ কাটিয়ে আবারও নড়াইলের আকাশে মাশরাফি নামের সূর্য হাসবে, এমন স্বপ্নই দেখছেন তার অনুসারীরা।