সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

বাংলাদেশের শিশুদের কি ৬ মাস বয়সে হামের প্রথম টিকা দেওয়া উচিত?

সম্ভাব্য ৩ ডোজের হামের টিকা সংক্রান্ত প্রস্তাবনা বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের অন্যতম বড় অর্জন ছিল জনস্বাস্থ্য খাতে সাফল্য। বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা এবং শিশু ও

সম্ভাব্য ৩ ডোজের হামের টিকা সংক্রান্ত প্রস্তাবনা

বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের অন্যতম বড় অর্জন ছিল জনস্বাস্থ্য খাতে সাফল্য। বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা এবং শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) দেশের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে উঠেছিল। একসময় বাংলাদেশ হাম নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষণা দেওয়ার অপেক্ষাই ছিল কেবল।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক শিশু হামের টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যাঘাতের ফলেই দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত কয়েক মাসে শত শত শিশুর মৃত্যু পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করে।

বাংলাদেশে বর্তমানে শিশুদের প্রথম হামের টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—বর্তমান পরিস্থিতিতে কি এই সময়সূচি পরিবর্তন করা প্রয়োজন?

কেন ৯ মাসে প্রথম টিকা?

হামের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

  • শিশুকে যত দ্রুত সম্ভব সুরক্ষা দেওয়া
  • টিকার সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করা

শিশুরা জন্মের সময় মায়ের শরীর থেকে কিছু প্রাকৃতিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পায়। পরে মাতৃদুগ্ধ থেকেও কিছু প্রতিরোধ ক্ষমতা পেয়ে থাকে। এই সুরক্ষা সাধারণত ৬ মাস বয়স পর্যন্ত তুলনামূলক শক্তিশালী থাকে।

এ কারণেই ৬ মাসের আগে হামের টিকা দেওয়া হয় না। কারণ তখন শিশুর শরীর টিকার প্রতি যথাযথ প্রতিক্রিয়া নাও দেখাতে পারে। তবে ৬ মাসের পর এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং ৯ মাসে এসে এর কার্যকারিতা অনেকাংশে হ্রাস পায়। তখন টিকা কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের মতো দেশে দীর্ঘদিন ধরে ৯ মাসে টিকা দেওয়ার নীতি কার্যকর ছিল, কারণ অধিকাংশ শিশু নিয়মিত টিকাদানের আওতায় থাকলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামষ্টিক সুরক্ষা তৈরি হয়। ফলে ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুরাও পরোক্ষভাবে সুরক্ষিত থাকে।

উন্নত দেশগুলো কেন ১২ মাসে টিকা দেয়?

যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার মতো দেশে প্রথম হামের টিকা সাধারণত ১২ মাস বয়সে দেওয়া হয় এবং দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ৪ থেকে ৬ বছর বয়সে।

এর কারণ হলো—

  • সেসব দেশে টিকাদান কর্মসূচি অত্যন্ত সফল
  • অধিকাংশ জনগোষ্ঠী হামমুক্ত
  • হার্ড ইমিউনিটি শক্তিশালী
  • ১২ মাসে শিশুর শরীরে মাতৃপ্রদত্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়, ফলে টিকার কার্যকারিতা সর্বোচ্চ হয়

তবে সেসব দেশেও বিশেষ পরিস্থিতিতে—যেমন মহামারি, উদ্বাস্তু সংকট বা আন্তর্জাতিক ভ্রমণজনিত ঝুঁকির সময়—৬ মাস বয়সে অতিরিক্ত ডোজ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা

বাংলাদেশ বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে—

  • নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে
  • হার্ড ইমিউনিটি দুর্বল হয়ে পড়েছে
  • হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে
  • শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়েছে

এই বাস্তবতায় ৯ ও ১৫ মাসে দুই ডোজের পরিবর্তে সাময়িকভাবে ৩ ডোজের টিকা চালুর প্রস্তাব এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।

সম্ভাব্য ৩ ডোজের প্রস্তাব

জনস্বাস্থ্য গবেষক হিসেবে আমার প্রস্তাব—

  • প্রথম ডোজ: ৬ মাসে
  • দ্বিতীয় ডোজ: ১২ মাসে
  • তৃতীয় ডোজ: ১৮ মাসে

৬ মাসে দেওয়া প্রথম ডোজ হয়তো দীর্ঘমেয়াদে পূর্ণ কার্যকারিতা নাও দিতে পারে, কারণ তখনও শিশুর শরীরে মাতৃপ্রদত্ত কিছু প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। তবে এটি তাৎক্ষণিক মৃত্যুঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পরবর্তী ১২ ও ১৮ মাসের ডোজ শিশুর দীর্ঘমেয়াদি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করবে।

সময় এসেছে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের

বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতি একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা। এমন সময়ে কেবল প্রচলিত নীতিমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা, সামাজিক পরিস্থিতি এবং চলমান ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অস্থায়ী বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।

সরকার চাইলে অন্তত আগামী দুই বছরের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ৬, ১২ ও ১৮ মাসে ৩ ডোজের হামের টিকা চালু করতে পারে। একইসঙ্গে তরুণ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ এবং ইপিআই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বিত আলোচনা প্রয়োজন।

শিশুদের জীবন রক্ষায় এখন দ্রুত, বৈজ্ঞানিক এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।

— শামীম আহমেদ

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন