নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঘটে যাওয়া এক বিভীষিকাময় রাত, যা ওলটপালট করে দিয়েছিল সাড়ে নয় বছরের এক নিষ্পাপ শিশুর চঞ্চল শৈশবকে। আজ তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের আতঙ্ক আর ট্রমা পিছু ছাড়েনি দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী লোপা রহমানের। ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতায় ‘সাহসী মেয়ে’ টাইটেল পাওয়া লোপা রহমান সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের জীবনের এক লুকিয়ে রাখা ভয়ানক ট্রমার কথা ভাগ করেছেন, যা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেছেন নেটিজেনরা।
১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরের এক শীতের রাতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তাদের বাসায় ঘটেছিল এক দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা। প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধার সেই বাড়িতে সেদিন গভীর রাতে ৪ জন ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী সশস্ত্র ডাকাত ঘরে ঢুকে লোপার মা, ভাই এবং নানীকে বেঁধে ফেলে। কিন্তু টাকা-পয়সা বা গহনা লুটের চেয়েও ডাকাতদের মূল লক্ষ্য ছিল সাড়ে ৯ বছরের শিশু লোপা।
লোপা রহমান তার পোস্টে স্মৃতিচারণ করে জানান, ঘটনার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে তার ছোট চাচা জোরাজুরি করে তাকে ঢাকার বাসায় বেড়াতে নিয়ে যান। ভাইয়ার পরীক্ষা থাকায় সে যেতে পারেনি। সেই রাতেই ডাকাতরা বাসায় ঢুকে লোপাকে না পেয়ে পুরো ঘর তন্ন তন্ন করে খোঁজে। এমনকি তার ভাইয়ের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে থাকে “লোপা কই?”
লোপা জানান, ডাকাত দলের সেই যুবকদের তার মা বিভিন্ন সময় লোপার স্টেজ পারফর্মেন্সের সময় অডিয়েন্সে দেখেছিলেন। সেদিন যদি ছোট চাচা তাকে নিয়ে না যেতেন, তবে কী নৃশংসতা ঘটত— সেই কথা ভেবে আজও ভয়ে কুঁকড়ে যান এই শিল্পী।
বাসার সবকিছু লুট হলেও লোপা বেঁচে গিয়েছিলেন এক অলৌকিক সুবাদে। কিন্তু সেই সাড়ে নয় বছর বয়স থেকে আজ অব্দি তিনি এই মানসিক ট্রমা বয়ে বেড়াচ্ছেন। লোপা লিখেছেন, “সেই সময় থেকেই আমার দুঃস্বপ্ন দেখার সমস্যার শুরু যা এখনো আছে। বহুবার স্বপ্নে আমি নিজেকে মানুষ বা ভূতের হাতে কিডন্যাপ হতে দেখেছি। বহুবার স্বপ্নে আমার একমাত্র ভাইকে ভয়ংকরভাবে মারা যেতে দেখেছি।”
তিনি আরও জানান, সেই ৪ জন ডাকাতের একজন ছিল রহমত, যে পরবর্তীতে এলাকার কুখ্যাত অপরাধীতে পরিণত হয় এবং র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয়। তার মৃত্যুর পর এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল।
বর্তমানে দেশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনাগুলো লোপাকে বারবার ১৯৯৪ সালের সেই ভয়াল অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সমাজে নারীদের নিরাপত্তার অভাব তাকে প্রতিনিয়ত আতঙ্কিত করে।
নিজের ভেতরের লুকিয়ে থাকা ভয় প্রকাশ করে লোপা রহমান বলেন, “আমার এই অনুভূতি, আমার এই ভয়, এই ট্রমা আমি কোনদিন কারও সাথে শেয়ার করতে পারিনি। সারাজীবন ‘সাহসী মেয়ে’র অভিনয় করে গেছি। অথচ আমার সারা জীবন কেটেছে পুরুষদের ভয় পেয়ে…”
পোস্টের শেষে তিনি উল্লেখ করেন, এটি কোনো গল্প নয়; তৎকালীন সময়ে ‘প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি’ শিরোনামে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় এই নিউজ হয়েছিল, যার ফাইল এখনো নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় সংরক্ষিত আছে।
বন্ধুসভার সদস্য লোপা রহমানের এই অকপট স্বীকারোক্তি সমাজকে আরও একবার ভাবিয়ে তুলেছে একজন নারী সমাজে কতটা সফল বা ‘সাহসী’ হিসেবে পরিচিত হলেও, শৈশবের সেই ট্রমা কীভাবে তার পুরো জীবনকে তাড়া করে বেড়ায়।