বৃহত্তর যশোরের মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) প্রধান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর নায়ক ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ আলী হোসেন মনি আর নেই। আজ শুক্রবার (১২ জুন) সকালে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট যশোর জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছরেরও বেশি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা ও শ্বাসকষ্টসহ বার্ধক্যজনিত নানাবিধ রোগে ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গোটা যশোর জেলাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ মে শহরের রেল বাজারস্থ নিজ বাসভবনে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে আলী হোসেন মনিকে প্রথম দফায় যশোর জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকার ধানমন্ডি পপুলার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হলে তাঁকে পুনরায় যশোরে ফিরিয়ে আনা হয়।
সর্বশেষ গত সোমবার (৮ জুন) আবারও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় মঙ্গলবার রাতেই তাঁকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সকালে তিনি চিরবিদায় নেন।
ব্যক্তিগত জীবনে আলী হোসেন মনি গভীর শোকের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর সহধর্মিণী এবং একমাত্র পুত্রসন্তান রাজেন আলী রাজু বেশ আগেই প্রয়াত হয়েছেন। শেষ সময়ে বাবার চিকিৎসা ও দেখভালের জন্য কানাডা থেকে দেশে ফিরে পাশে ছিলেন তাঁর একমাত্র কন্যা ফারজানা আলী।
আজ শুক্রবার বাদ আসর নামাজে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
আলী হোসেন মনি ১৯৪৬ সালের ১৭ জানুয়ারি যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কাজীপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রয়াত রফিউদ্দিন এবং মাতা প্রয়াত মনোয়ারা বেগম।
তিনি যশোর মুসলিম একাডেমি থেকে এসএসসি, যশোর এম এম কলেজ থেকে এইচএসসি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
ষাট ও সত্তরের দশকের তুখোড় এই ছাত্রনেতা ছাত্রজীবনেই তৎকালীন যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (সে সময়ে সভাপতি ছিলেন একরামুল কবির)। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যশোরাঞ্চলে তাঁর অবদান ছিল কিংবদন্তিতুল্য। স্বাধীনতার ঘোষণা আসার পর তিনি ভারতের দেরাদুনে প্রথম ব্যাচে বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। দেশমাতৃকাকে মুক্ত করতে এরপর তিনি বৃহত্তর যশোরের মুজিব বাহিনীর প্রধান (আঞ্চলিক অধিনায়ক) হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি নেতৃত্ব দেন। তাঁর রণকৌশল ও সাহসিকতায় যশোরাঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পরাস্ত হয়েছিল।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং দীর্ঘদিন জেলা জাসদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। জাসদ বিভক্ত হলে তিনি জাসদ (ইনু)-র জেলা সভাপতির দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে জাসদের ঐক্যের পর তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। জেলা আওয়ামী লীগের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থাকলেও দলের একজন শীর্ষ অভিভাবক ও নিবেদিতপ্রাণ নেতা হিসেবে প্রতিটি নির্বাচনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনির মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন যশোরের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। নেতৃবৃন্দ শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন।