সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

ইউনূসের ‘কালো আইন’ বাতিল: এবার অবসান হোক ভুক্তভোগীদের সীমাহীন হয়রানির

‘বিচারের আগেই কি কাউকে ফাঁসি দেওয়া যায়?’এই প্রশ্নটি সাধারণ চোখে অবান্তর মনে হলেও, বিগত দেড় বছরের শাসনপ্রক্রিয়া দেশের সচেতন নাগরিকদের মনে ঠিক এই প্রশ্নটিই বারবার

‘বিচারের আগেই কি কাউকে ফাঁসি দেওয়া যায়?’এই প্রশ্নটি সাধারণ চোখে অবান্তর মনে হলেও, বিগত দেড় বছরের শাসনপ্রক্রিয়া দেশের সচেতন নাগরিকদের মনে ঠিক এই প্রশ্নটিই বারবার উসকে দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ উপযুক্ত আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা আইনের শাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে এই মৌলিক সাংবিধানিক চেতনাকে প্রতি পদে পদে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।

ইউনূস সরকারের শাসনামলে সবচেয়ে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের সংশোধন। তথাকথিত ‘আন্ডার কাভার’ তদন্তের নামে হয়রানি, কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই ঢালাওভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ এবং সম্পত্তি ক্রোক করার মতো চরম স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল এই সংশোধিত আইনে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দুদক সংস্কার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের আলোকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে দুদক আইন-২০০৪-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য গত ২৩ ডিসেম্বর একটি প্রজ্ঞাপন বা অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই দুদক অধ্যাদেশসহ ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়। আইন অনুযায়ী, ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত না হওয়ায় গত ১১ এপ্রিল থেকে ওই বিতর্কিত অধ্যাদেশটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং আগের মূল দুদক আইন-২০০৪ পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, নতুন সংসদ অন্তর্বর্তী সরকারের সেই চরম স্বেচ্ছাচারী ও সংবিধান পরিপন্থী অধ্যাদেশ গ্রহণ না করে একটি সঠিক ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আইনটি কাগজ-কলমে বাতিল হলেও, দেড় বছর ধরে এই কালো আইনের যাতাকলে পিষ্ট হওয়া মানুষ ও দেশের অর্থনীতির ক্ষত এখনো শুকায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এই আইনের অপব্যবহার করে প্রায় দেড় হাজার ব্যবসায়ী এবং নিরীহ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা চার্জশিট ছাড়াই স্রেফ সন্দেহের বশে প্রায় ১ হাজার শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীর ওপর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অবরুদ্ধ করা হয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ।

এই পাইকারি জব্ধকরণ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় মূল্য চকাতে হচ্ছে দেশের বেসরকারি খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন, যার ফলে নতুন করে বেকার হয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ।

বৈধ ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী যথাসময়ে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খেলাপি ঋণের ওপর। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টি ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এমনকি সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক এবং বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মতো সবল আর্থিক সূচকের ব্যাংকগুলোও এখন খেলাপি ঋণের বোঝায় জর্জরিত।

দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধে পৃথিবীর কোনো আধুনিক বা সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন নিকৃষ্ট আইনি ধারা নেই।

ভারতের ১৯৮৮ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন (২০১৮ সালে সংশোধিত) এবং ২০০২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, সিবিআই বা ইডি-র মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাও আদালতের রায় বা সুনির্দিষ্ট চার্জশিট ছাড়া কারও সম্পত্তি পূর্ণাঙ্গভাবে জব্দ বা বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে না।

১৯৪৭ সালের মূল আইন অনুযায়ী, আদালতে দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগে ব্যাংক হিসাব বা সম্পদ ক্রোক করা যায় না।

‘ব্রিবারি অ্যাক্ট-২০১০’ এবং ‘প্রসিডিংস অব ক্রাইম অ্যাক্ট-২০০২’ (POCA) এর অধীনে অবৈধ অর্থের ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত কারণে সাময়িক হিসাব স্থগিত করা গেলেও, অন্তহীন সময়ের জন্য বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কোনো বিধান নেই।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের অবাধ চলাফেরা ও দেশত্যাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তদুপরি, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ‘দুদক বনাম জি বি হোসেন’ (৭৪ ডিএলআর) মামলার ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট করে বলেছে” একজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা আছে, স্রেফ এই অজুহাতে তাকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া যাবে না এবং তাকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।” ফলে, বিগত দেড় বছর ধরে যে অন্তহীন নিষেধাজ্ঞা ও হয়রানি চালানো হয়েছে, তা কেবল সংবিধানের লঙ্ঘনই ছিল না, বরং তা ছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় অমান্য করার শামিল।

বর্তমান নির্বাচিত সরকার এই কালো আইনটি সংসদে পাস না করে বাতিলের সুযোগ দিয়ে তাদের প্রাথমিক সদিচ্ছার প্রমাণ দিয়েছে। তবে আইনি ব্যবস্থার পরিবর্তন হলেও মাঠপর্যায়ে ভুক্তভোগীদের মুক্তি মেলেনি। যাদের অ্যাকাউন্ট এখনো অবরুদ্ধ, যাদের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিদেশ যাওয়ার পথ বন্ধ, তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকারকে দ্রুত নির্বাহী পদক্ষেপ নিতে হবে। অবিলম্বে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ব্যাংক হিসাব সচল করা এবং অবৈজ্ঞানিক বিদেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাদের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক জীবনে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আইনের শাসন যেন কেবল কাগজে কলমে না থেকে বাস্তবে রূপ পায়, নতুন সরকারের কাছে এটিই জনমানুষের প্রত্যাশা।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন