২০২১ সালের ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের রয়েল রিসোর্টে ঘটে যাওয়া বহুল আলোচিত ‘রিসোর্টকাণ্ড’কে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের একটি ‘ব্যর্থ প্রজেক্ট’ এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার চক্রান্ত বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। শনিবার (২০ জুন) নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি সেদিনের ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ, প্রথম স্ত্রীর নাম ব্যবহারের কারণ, তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থার প্রস্তাব এবং জান্নাত আরা ঝর্ণার সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতিসহ নানা অজানা তথ্য প্রকাশ করেছেন।
ফেসবুক পোস্টে মাওলানা মামুনুল হক জানান, ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল তিনি তার তৎকালীন স্ত্রী জান্নাত আরাকে (ঝর্ণা) নিয়ে রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নম্বর কক্ষে অবস্থান করছিলেন। সে সময় পুলিশের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী ও কিছু সংবাদকর্মী জোরপূর্বক কক্ষে প্রবেশ করে লাইভ সম্প্রচার শুরু করে এবং তাদের হেনস্তা করে। পরিস্থিতি থেকে রক্ষায় তিনি স্ত্রীকে ওয়াশরুমে রাখলেও নারী পুলিশ সদস্যরা সেখানে ঢুকেও লাইভ করেন।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা বৈবাহিক সম্পর্কের কথা জানালেও প্রথমে পুলিশ মোবাইল কেড়ে নেয় এবং পরে ডিজিএফআই কর্মকর্তারা এসে তাদের থানায় নেওয়ার নির্দেশ দেন। মাওলানা মামুনুল হক প্রশ্ন তোলেন, তারা কোনো আইন ভঙ্গ না করা সত্ত্বেও কোন বৈধতায় তাদের কক্ষে প্রবেশ করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যক্তিগত কল রেকর্ড ফাঁস করা হয়েছিল?
জান্নাত আরার সঙ্গে বিয়ে প্রসঙ্গে তিনি জানান, জান্নাত আরা আগে তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হাফেজ শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন। পারস্পরিক সম্মতিতে তাদের বিবাহবিচ্ছেদের পর জান্নাত আরার আগ্রহে শরিয়ত অনুযায়ী তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
বিয়ে গোপন রাখার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, উপমহাদেশে একাধিক বিয়ে সামাজিকভাবে জটিল এবং তিনি প্রথম পরিবারে অস্থিরতা চাননি। এছাড়া রাষ্ট্রীয় আইনে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টিও জটিলতা সৃষ্টি করেছিল। পরিচয়পত্রে প্রথম স্ত্রী আমিনা তাইয়েবার নাম ব্যবহারের বিষয়ে তিনি জানান, আলোচনার ভিত্তিতেই তারা এটি করেছিলেন। আর প্রথম স্ত্রীকে ফোনে জান্নাত আরাকে ‘শহিদুল ইসলামের স্ত্রী’ বলে পরিচয় দেওয়ার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, প্রথম স্ত্রী আগে থেকেই তাকে ওই পরিচয়ে চিনতেন, তাই পরিস্থিতি শান্ত রাখতেই তিনি তাৎক্ষণিক সেই পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন।
খেলাফত মজলিসের আমির অভিযোগ করেন, রিসোর্ট ঘটনার পর তৎকালীন এনএসআই মহাপরিচালক তার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাকে হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তাব দেন, যা তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এর জেরে জান্নাত আরা, তার বাবা ও সাবেক স্বামীর ওপর বিভিন্ন চাপ প্রয়োগসহ জান্নাত আরাকে দীর্ঘ সময় হেফাজতে রাখা হয়। এমনকি আদালতে জান্নাত আরার ছেলে আব্দুর রহমানকে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিতে উৎসাহিত করা হলেও সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরায় সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় বলে তিনি দাবি করেন। তার বিরুদ্ধে প্রচারিত ‘মুতা বিয়ে’ বা চুক্তিভিত্তিক বিয়ের অভিযোগকে তিনি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অপপ্রচার বলে আখ্যা দেন।
জান্নাত আরার বর্তমান অবস্থান স্পষ্ট করে মামুনুল হক জানান, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় ছিল। তবে ২০২১ সালের ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর তৈরি হওয়া বিভিন্ন মনোমালিন্যের কারণে উভয়ের আলোচনার ভিত্তিতে গত ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তাদের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ঘটে। তবে বিচ্ছেদের আগ পর্যন্ত এবং নিজের দীর্ঘ কারাবাসকালেও জান্নাত আরার ভরণপোষণসহ প্রাপ্য সব অধিকার তিনি নিশ্চিত করেছিলেন বলে দাবি করেন।
দীর্ঘ পোস্টে নিজের চরিত্রহননের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি পবিত্র কোরআনের সূরা আল ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে ‘মুবাহালা’র (মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহর লানত বর্ষণের উন্মুক্ত চ্যালেঞ্জ) আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তার এই বক্তব্যকে কেউ মিথ্যা প্রমাণ করতে চাইলে যে কেউ তার সঙ্গে এই চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে পারেন।
পোস্টের শেষাংশে মামুনুল হক উল্লেখ করেন, ‘৫০১ নম্বর কক্ষ’ তার কাছে কোনো ক্ষোভ বা নেতিবাচক বিষয় নয়। বরং এটি ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের দলিল। ‘৫০১’কে তারা বিজয়ের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করছেন এবং ভবিষ্যতে এটি উদযাপন করবেন বলেও তিনি ঘোষণা দেন।