পর্দার আড়ালে কারা?
একটি ভুয়া ফেসবুক আইডি, একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ধর্মীয় অবমাননার পোস্ট এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একটি শান্ত গ্রাম পরিণত হলো রণক্ষেত্রে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের গড়কাটি গ্রামে গত ২৩ জুন (মঙ্গলবার) যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হলো তা কোনো আকস্মিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে এটি ছিল সুপরিকল্পিত একটি চক্রান্ত। যার পেছনে কাজ করেছে ব্যক্তিগত শত্রুতা এবং রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অপচেষ্টা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গড়কাটি গ্রামের বাসিন্দা তপন রায়ের ছেলে প্রিন্স রায় দীপ্তর কোনো সম্পৃক্ততা ছাড়াই তার নাম ও ছবি ব্যবহার করে হুবহু একটি ভুয়া (ফেক) ফেসবুক প্রোফাইল তৈরি করা হয়। দীপ্তর ছবি ব্যবহার করে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উস্কানিমূলক পোস্ট দেওয়া হয়। যাতে খুব সহজেই স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষকে উত্তেজিত করা যায়।
সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের ভুয়া আইডি তৈরির পর স্ক্রিনশট নিয়ে তা পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্থানীয় গ্রুপ ও মেসেঞ্জারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। যাতে মূল আইডিটি ডিলিট হওয়ার আগেই তা জনমনে ক্ষোভের আগুন জ্বলাতে পারে।
মঙ্গলবার সকালে পোস্টটি ভাইরাল হওয়ার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকলে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। বাদাঘাট বাজার থেকে দীপ্তকে সুরক্ষার স্বার্থে নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ। কিন্তু ততক্ষণে গুজবের ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছে।

অনুসন্ধানী তথ্যে দেখা যায়, পুলিশ যখন আইডিটির সত্যতা যাচাইয়ে ব্যস্ত। ঠিক তখনই একদল চিহ্নিত সুযোগসন্ধানী, উগ্রপন্থী এবং স্থানীয় ধর্মীয় ব্যবসায়ী সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মাঠে নামে।
ভুক্তভোগী পরিবারের ঘর ও দোকানে হামলা চালিয়ে শুধু ভাঙচুরই করা হয়নি, ঘরের মূল্যবান আসবাবপত্র, পানির মোটর এমনকি নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করা হয়। যা প্রমাণ করে হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য শুধু ‘প্রতিবাদ’ ছিল না, বরং অপরাধমূলক লুণ্ঠনও ছিল।
তাহিরপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গড়কাটি কালী মন্দির ও দুর্গা মন্দিরসহ ৩টি মন্দিরের তালা ভেঙে প্রতিমা ভাঙচুর এবং মূল্যবান কাঁসার জিনিসপত্র চুরি করা হয়।
তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুর ইসলামের নেতৃত্বে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহায়তায় দ্রুততম সময়ে এই ঘটনার তদন্ত শেষ করা হয়।
পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, প্রযুক্তিগত তদন্তে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে যে আটক যুবকের আসল আইডি থেকে কোনো পোস্ট করা হয়নি। একটি কুচক্রী মহল এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতে এবং ওই পরিবারটিকে ধ্বংস করতে সম্পূর্ণ ভুয়া আইডি ব্যবহার করেছিল। দীপ্ত এবং তার পরিবার সম্পূর্ণ নির্দোষ।
এই ঘোষণাটির পর অপরাধীদের আসল চেহারা উন্মোচিত হলেও, ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। নির্দোষ একটি পরিবার আজ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব।
স্থানীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার পেছনে দুটি প্রধান দিক কাজ করতে পারে, ভুক্তভোগী পরিবারটিকে এলাকাছাড়া বা আর্থিকভাবে পঙ্গু করতে কোনো স্থানীয় চক্র এই ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিংয়ের আশ্রয় নিয়েছে। তাহিরপুরের দীর্ঘদিনের শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত ফায়দা লোটার চেষ্টা।
বর্তমানে গড়কাটি গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২০ সদস্যের একটি ‘সম্প্রীতি কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। তবে গ্রামে এখনও একধরণের থমথমে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পুরুষ সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
চলমান বিষয়টিকে ইস্যু করে সারা দেশে এক শ্রেণির মৌলবাদি চক্র প্রতিবাদ সভা করছে। এমনকি কোনো প্রমাণ বা বিচার ছাড়াই ওই যুবককে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের উচিৎ সিসিটিভি ফুটেজ এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট (আইপি অ্যাড্রেস) ট্র্যাক করে যে বা যারা এই ভুয়া আইডি খুলেছিল, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। গুজব যে-ই ছড়াক, যারা আইন হাতে তুলে নিয়ে ঘরবাড়ি ও মন্দিরে ভাঙচুর-লুটপাট চালিয়েছে, তারা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধী। তাদের দ্রুত সনাক্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে “ফেসবুকে দেখলেই তা সত্য নয়”—এই বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। যাতে ভবিষ্যতে কোনো ভুয়া আইডির কারণে আর কোনো নির্দোষ মানুষের জীবন ও সম্পদ বিপন্ন না হয়।
তাহিরপুরের এই ঘটনাটি আরও একবার মনে করিয়ে দিল, ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার সমাজে কতটা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারে কি না।