সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

পুলিশ সদরদপ্তর ‘গুজব’ বললেও ২ থানা জানালো ৩ লাশ উদ্ধারের তথ্য: রয়েছে নিহতদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও

তুরাগ নদ থেকে তিন তরুণের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী চরম উত্তেজনা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। একদিকে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্র এটিকে পুলিশ

তুরাগ নদ থেকে তিন তরুণের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী চরম উত্তেজনা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। একদিকে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্র এটিকে পুলিশ এবং প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মীদের যৌথ অভিযানের মুখে পড়ে সলিলসমাধির ঘটনা বলে দাবি করছে; অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসন পুরো বিষয়টিকে ‘দুর্ঘটনা’ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘অপপ্রচার’ বলে অভিহিত করেছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম এর প্রতিবেদন ও স্থানীয় অনুসন্ধানে এই ঘটনা ও লাশ উদ্ধারের বিষয়ে পুলিশ এবং নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিবারিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ২২ জুন দুপুরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী দিয়াবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় একটি ঝটিকা মিছিল বের করেন। মিছিল শেষে বিকেলে মিরপুর বেড়িবাঁধ ঘাট থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করে তারা আশুলিয়া বাজার ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হন। নৌকার ভেতরে অবস্থানকালে তারা রাজনৈতিক স্লোগান ও শপথ নেন। দীর্ঘ সময় নদীতে তাদের এই অবস্থান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর একপর্যায়ে বাইরে জানাজানি হয়ে যায়।

অভিযোগ উঠেছে, নৌকাটি যখন আশুলিয়া বাজার ঘাটে এসে পৌঁছায়, তখন আশুলিয়া বাজার পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল এবং স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক কর্মী সেখানে অবস্থান নিচ্ছিলেন। নৌকাটি ঘাটে ভিড়তেই প্রথম দফায় নেমে যাওয়া ৭-৮ জনকে আটকে ফেলা হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নৌকার মাঝিরা ঘাট থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র ধস্তাধস্তি ও হট্টগোল শুরু হয়। এই ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বেশ কয়েকজন নদীতে পড়ে যান। এদের মধ্যে সুমন, বিপ্লবসহ তিনজন সাঁতার না জানার কারণে পানিতে ডুবে মারা যান বলে দাবি করা হচ্ছে।

তুরাগ নদীতে ভয়াবহ ও পরিকল্পিত হামলার শিকার আমরা সবাই মিলে টলারে করে তুরাগ নদীতে শপথ নিয়েছিলাম। শতাধিক নেতাকর্মী ছিলো মিরপুর এলাকায় মিছিল করার ইচ্ছা ছিলো। স্থানীয় বিএনপির লোকজন জানতে পারে এরা মিছিল করতে যাচ্ছে । আমরা যখন ঘাটে আসি বিএনপির নেতাকর্মী ও পুলিশ হামলা করে। পুলিশের সাথে বিএনপির নেতারা আমাদের মারধর টানা হেঁচড়া করে। আমাদের প্রায় সবার মোবাইল হারিয়ে গেছে। কয়েকজন প্রাণ বাঁচাতে নদীতে লাফ দেয় । এদের মধ্যে তিনজনরে মরদেহ পরে উদ্ধার হয়েছে। এখনও ৪ জনের কোনো খবর পাচ্ছি না। প্রায় সবার সাথে সবার যোগাযোগ বন্ধ মোবাইল না থাকাতে। আমরােচেষ্টা করছি যারা শপথে ছিলো সবার সাথে কন্টাক করার। নিঁখোজ হওয়ার সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে।

-তৌয়বুর রহমান, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সদস্য ।

নিহত সুমনের খালু বাবু গণমাধ্যমকে জানান, ২২ তারিখ রাতে সুমনের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাই। পরে জানতে পারি, আওয়ামী লীগের মিছিল শেষে আশুলিয়া ঘাটে নামতে গেলে ধস্তাধস্তির মুখে অনেকে নদীতে পড়ে যায়। সে সাঁতার জানতো না। ২৩ তারিখ রাত থেকে খোঁজাখুঁজির পর ২৪ তারিখে দুইজনের লাশ পাওয়া যায়, যারা সুমনের সাথেই ছিল। পরে ২৫ তারিখে পুলিশ ফোন করে আশুলিয়া ব্রিজের কাছ থেকে সুমনের লাশ উদ্ধারের তথ্য জানায়।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠেছে যে, ঘটনার পর থেকে নিহতদের পরিবারগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। গ্রেফতার বা আইনি হয়রানির ভয়ে সুমনের বাবা গত দুই দিন ধরে পলাতক রয়েছেন। একইভাবে নিহত অপর তরুণ বিপ্লবের পরিবারও এলাকায় একাকী থাকার কারণে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এবং গত তিন দিন ধরে তাঁর বাবা-মায়ের কোনো খোঁজ মিলছে না। ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, পুলিশি ভীতির কারণে মূল ধারার গণমাধ্যমগুলো প্রথম দিকে পরিবারের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে পারেনি।

এদিকে এই ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা ও তথ্য ছড়াতে শুরু করলে বাংলাদেশ পুলিশ সদরদপ্তর এবং আশুলিয়া ও দারুস সালাম থানা পুলিশ তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, তুরাগ নদে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সাত নেতাকর্মীর মরদেহ ভাসছে এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব। পুলিশ সদরদপ্তর বিষয়টিকে গুজব বললেও স্থানীয় আশুলিয়া ও দারুস সালাম থানা পুলিশ নদী থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছে।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যরা সুমনকে শনাক্ত করেন। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, পরিবার প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের জানিয়েছে যে সুমন ২২ জুন বন্ধুদের সাথে পিকনিকে গিয়েছিলেন এবং সাঁতার না জানার কারণে ট্রলার থেকে পড়ে ডুবে যান।

ঘটনাটি নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। এটি একটি দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক সংঘাত ছিল। তা নিশ্চিত হতে পুলিশ ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন