রাজধানীর পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কেন্দ্রীয় মন্দিরের পুরোহিত সুভাষ দেউরীকে (২৫) আটকে রেখে রাতভর বর্বর নির্যাতন, টাকা আদায় এবং পরবর্তীতে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একদল যুবকের বিরুদ্ধে। বর্তমানে তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সোমবার (২৯ জুন) রাত আনুমানিক ১২টার দিকে ওয়ারী থানার ১৫ নম্বর নারিন্দা রোডে অগ্রণী ব্যাংকের সামনে প্রথম হামলার শিকার হন তিনি। পরে তাকে একটি মেসে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
আহত সুভাষ দেউরীর রুমমেট দুর্জয় সাহা জানান, সোমবার রাতে ওষুধ কেনার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছিলেন সুভাষ। পথিমধ্যে একদল দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথা, হাত ও পায়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে এবং মোবাইল-মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় অচেতন পড়েছিলেন। সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে সকাল ৮টার দিকে তাকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তবে হাসপাতাল শয্যায় চিকিৎসাধীন সুভাষ দেউরী ঘটনার ভিন্ন এবং আরও ভয়াবহ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি জানান, মাইগ্রেনের সমস্যার কারণে মাঝে মাঝে একা হাঁটতে বের হন। সোমবার রাত ৮টার দিকে রিকশা নিয়ে স্বামীবাগ যাওয়ার পর হঠাৎ করেই তিনি নিখোঁজ হন।
সুভাষ বলেন, রাতে চেতনা ফিরলে দেখি ৭ থেকে ৮ জন যুবক আমাকে একটি মেস বাসার ভেতরে আটকে রেখেছে। তাদের দেখে মাদকাসক্ত মনে হচ্ছিল এবং তারা ভেতরে ইয়াবা সেবন করছিল। তারা আমাকে মারধর করে মোবাইল ও মানিব্যাগ হাতিয়ে নেয়। মোবাইলের মেসেজ ঘেঁটে আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ লাখ৩৬ হাজার টাকা থাকার কথা জানতে পেরে তারা ৩০ হাজার টাকা দাবি করে। কিন্তু ব্যাংকিং অ্যাপ বা চেক বই না থাকায় তারা সরাসরি টাকা তুলতে পারছিল না।
সুভাষ আরও জানান, এরপর যুবকেরা তার রুমমেটকে ফোন করিয়ে বিকাশের মাধ্যমে ৬ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে তার বোন জয়ার কাছে ফোন করে আরও ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করে।
ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নির্যাতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি নিজেকে দিনমজুর পরিচয় দিয়েছিলাম। মন্দিরের পুরোহিত সেটি বলিনি। কিন্তু গলায় হিন্দু ধর্মের মালা থাকায় তারা বুঝে নেয় আমি হিন্দু। সারারাত তারা আমার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে আমি পালানোর জন্য কৌশলে আমাকে ছাদে নিয়ে যেতে বলি। কিন্তু ছাদ থেকে আমি কীভাবে নিচে পড়ে গেলাম, নাকি তারাই আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল—তা আর মনে নেই। পরে জ্ঞান ফিরলে দেখি কেউ একজন আমাকে রিকশায় তুলে দিচ্ছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মন্দির কমিটির আহ্বায়ক প্রিয়ন্ত স্বর্ণকার বলেন, সুভাষ দেউরী গুরুতর আহত অবস্থায় নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। প্রাথমিকভাবে ছিনতাইয়ের কথা শুনলেও ঘটনার বিস্তারিত এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো আমরা জানার চেষ্টা করছি।
এদিকে ছিনতাই হওয়া মোবাইল থেকে সুভাষের বোন জয়ার কাছে ফোন করে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি আরও ২০ হাজার টাকা দাবি করার পর পরিবার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক ফারুক হোসেন জানান, আহত পুরোহিতের চিকিৎসা চলছে। ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট ওয়ারী থানাকে অবহিত করা হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তবে ঘটনার সত্যতা নিয়ে ওয়ারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিউর রহমান বলেন, ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমেই আমরা প্রথম জানতে পেরেছি। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। অভিযোগ পেলে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।