সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

তুরস্কের সঙ্গে জামায়াতের বহুমুখী সম্পর্ক ও ভূরাজনৈতিক নীলনকশা: নেপথ্যে কিছু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক যোগসূত্র নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী রেডিয়েন্ট

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক যোগসূত্র নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস এবং বাংলাদেশে টার্কিশ এয়ারলাইনসের জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) ‘অ্যারোমেট সার্ভিসেস লিমিটেড’-এর অন্যতম কর্ণধার ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহরিয়ার নাসের জাহেদীর জামায়াতে যোগদানের গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে এই রাজনৈতিক মেরুকরণ ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিশেষজ্ঞ ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে জামায়াতকে সাংগঠনিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং একটি আধুনিক রূপ দিতে নেপথ্যে কাজ করছে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একে পার্টি)।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি শাহরিয়ার নাসের জাহেদী ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর আগে ২০০৮ সালের পূর্বে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ২০০৭ সালের ১/১১-এর সময় তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।

সম্প্রতি ঝিনাইদহসহ রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন উঠেছে যে, জাহেদী জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে যোগ দিয়েছেন। যদিও জাহেদী নিজে এই তথ্য অস্বীকার করেছেন, তবে জামায়াতের সঙ্গে তার এবং তুরস্কের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা এখন ওপেন সিক্রেট। তিনি টার্কিশ এয়ারলাইনসের জিএসএ ছাড়াও তুরস্ক থেকে আসা জাকাত ফান্ড পরিচালনাসহ দেশটির একাধিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাহেদীর মতো তুরস্ক-কেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের জামায়াতমুখী হওয়া সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ইঙ্গিত বহন করে।

ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ১৯২৮ সালে মিসরে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম ব্রাদারহুড (ইখওয়ানুল মুসলিমিন) এবং ১৯৪০ সালে সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী একই রাজনৈতিক-ইসলামি মতাদর্শ শেয়ার করে। গত ২৩ বছর ধরে তুরস্কের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের দল ‘একে পার্টি’ ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ককে একটি রক্ষণশীল ইসলামপছন্দ রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবেই আঙ্কারা বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিয়েছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

২০১৬ সালে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায়ের নিন্দা জানিয়ে তুরস্ক প্রথম এই সম্পর্ক প্রকাশ্যে আনে। তুরস্কের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ-এর উপদেষ্টা সেলচুক কোলাগলুর ২০১৯ সালের এক নিবন্ধেও মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড ও বাংলাদেশের জামায়াতকে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনের বিষয়টি উঠে আসে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ও তুরস্কের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের সুফল কাজে লাগিয়ে তুরস্কের সঙ্গে ব্যবসা করা বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশ করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর)-এর নামে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত মাদ্রাসা ও প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

একই সাথে জামায়াতকে আধুনিক রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তুরস্ক এক মাস্টারপ্ল্যান বা নীলনকশা তৈরি করেছে, তুরস্কের ক্ষমতাসীন দলের আদলে জামায়াত কর্মীদের তুরস্কে নিয়মিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের অসংখ্য সদস্যকে উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ দিয়ে তুরস্কে পাঠানো হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, বাইরে উদার ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রদর্শন এবং পোশাকে-আচরণে আধুনিকতার মুখোশ পরার পরামর্শ দিচ্ছে আঙ্কারা।

সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্পর্ক আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। গত মে মাসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তুরস্কের হুদা পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান হুসাইন এমির। এরপর জুনের প্রথম সপ্তাহে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশ সফরকালে জামায়াতের আমিরের সঙ্গে একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত এখন আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেদের অতীত আড়াল করতে ‘উদারতা’ ও ‘আধুনিকতার’ যে রাজনীতির কথা বলছে, তা মূলত ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে ঢোকার একটি কৌশলগত মুখোশ মাত্র। একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার ইতিহাসকে আড়াল করে তুরস্কের সহযোগিতায় জামায়াতের এই ক্ষমতাকেন্দ্রীক নীলনকশা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন