জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ‘এক টাকার দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারলে পদত্যাগ করবেন’ এমন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তবে তাঁর এই প্রকাশ্য ঘোষণার বিপরীতে নিজ নির্বাচনী এলাকা দেবিদ্বারে একটি সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে স্থানীয় মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
দেবিদ্বার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মরিচাকান্দা পূর্বপাড়ার ‘বাইতুলফালাহ জামে মসজিদ’ সংস্কার প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই অনিয়মের ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জাতীয় নির্বাচনের আগে এই সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বাইতুলফালাহ জামে মসজিদটি সংস্কার করে দেওয়া হবে। বিনিময়ে নির্বাচনে বিশেষ প্রতীকে (শাপলা কলি) ভোট দেওয়ার একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনে জয়লাভের পর দীর্ঘ সময় কাজ না হওয়ায় সমালোচনা শুরু হলে, এমপির কয়েকজন অনুসারী এসে তড়িঘড়ি করে নামমাত্র কিছু সংস্কার কাজ সম্পন্ন করেন।
মসজিদ কমিটির উপদেষ্টা সিরাজুল ইসলাম মিরণ জানান, তারা বলেছিল হাসনাত ভাই ব্যক্তিগতভাবে কাজটা যত টাকা লাগে করে দেবে। আমরা একজন সাধারণ ঠিকাদারের সাথে আলাপ করে জেনেছি, যেটুকু কাজ করা হয়েছে তার সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা।
ব্যক্তিগত তহবিলের কথা বলা হলেও পরবর্তীতে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ই-টেন্ডারের মাধ্যমে জেলা পরিষদ থেকে ওই মসজিদ সংস্কারের জন্য ১১ লাখ ৮১ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের একটি সমন্বয় সভায় অংশ নিয়ে মসজিদ কমিটি এই সরকারি বরাদ্দের বিষয়ে জানতে পারে। সরকারি বড় অঙ্কের এই বরাদ্দের কথা মসজিদ কমিটির কাছে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল।
মসজিদের উপদেষ্টা মিরণ আক্ষেপ করে বলেন, হাসনাত ভাই সবসময় নীতির কথা বলেন। কিন্তু আমাদের সাথে ১২ লাখ টাকার এই বাজেট নিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে, যা সমাজবাসীকে খুব কষ্ট দিয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রকল্পের সরকারি টাকা তুলতে এবং কাজ ভাগাভাগি করতে গড়ে উঠেছে একটি জটিল সাব-ঠিকাদারি চক্র। মূল কার্যাদেশ পেয়েছিল ‘মেসার্স মমতাজ এন্টারপ্রাইজ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান। এর স্বত্বাধিকারী মো. ফরহাদুল মিজান স্বীকার করেন যে, তিনি কাজটি নিজে না করে পরিচিত ‘বিল্লাল হোসেন’ নামের এক ব্যক্তিকে সাব-ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই বিল্লাল হোসেন দেবিদ্বার ক্যাপ্টেন সুজাত আলী সরকারি কলেজের নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি এবং জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
বিল্লাল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তিনি নিজে কাজ না করে ‘রিয়াদ’ নামের স্থানীয় এক রাজনৈতিক কর্মীকে কাজটি হস্তান্তর করেছেন। তবে প্রাপ্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিল্লাল মুখে রিয়াদের কথা বললেও বাস্তবে কাজটি বাস্তবায়ন করেছে তাঁর নিজের ছোট ভাই ইকবাল হোসেন। অন্যদিকে ই-টেন্ডারের মূল আবেদনকারী ইয়াহিয়া জানান, জেলা পরিষদ বা ঠিকাদাররা তাকে বরাদ্দের কোনো কাগজ দেখাননি এবং সম্পূর্ণ বিষয়টি নিয়ে টালবাহানা করা হয়েছে।
সরকারি অর্থ নয়-ছয় এবং বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা আত্মসাতের এই অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলাম জাকারিয়া বলেন, বিষয়টি আমি নোটডাউন করেছি এবং খোঁজখবর নিচ্ছি। তদন্তে যদি সত্যি সত্যি কোনো অনিয়ম বা ব্যত্যয় পাওয়া যায়, তবে জেলা পরিষদ প্রশাসক মহোদয়ের সাথে আলোচনা করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সাথে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে কোনো প্রকার দুর্নীতি বা অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।