সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে মন্ত্রীর ‘উন্মুক্ত’ ঘোষণার ২৪ ঘণ্টাতেই মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা: বিভ্রান্তিতে প্রবাসীকামীরা

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়া নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পেয়েছে। গত মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আকস্মিকভাবে ঘোষণা দেন, আগের দিন

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়া নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পেয়েছে। গত মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আকস্মিকভাবে ঘোষণা দেন, আগের দিন সোমবার থেকেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলে গেছে। কিন্তু এই বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই বুধবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক জরুরি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এখনো খোলেনি। একই সাথে মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের কাউকে কোনো টাকা-পয়সা না দেওয়ার জন্য সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়।

সরকারি একটি দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এমন অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করা বক্তব্যের কারণে মাঠপর্যায়ে সাধারণ কর্মী ও সাধারণ মানুষ চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে পুঁজি করে অসাধু এজেন্সি বা আদম ব্যাপারীরা প্রবাসীকামীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ নিতে পারে। আর এমনটি হলে এর দায় কে নেবে তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে।

গত মঙ্গলবার মন্ত্রী তার বক্তব্যে দাবি করেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নতুন ও বিদ্যমান শ্রমবাজার সম্প্রসারণে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার উন্মুক্ত হয়েছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘বাসস’ মন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রচার করার পর দেশের মূলধারার অন্তত শতাধিক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় খবরটি ফলাও করে প্রচার করা হয়।

তবে অনুসন্ধানী তথ্যের ভিত্তিতে একমাত্র দৈনিক সমকাল এই খবরটি প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। এর আগে গত ২৪ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কুয়ালালামপুর সফরের পর সমকালের লিড রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছিল ‘শিগগির খুলছে না মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার’। সেখানে বাজার খুলতে বিলম্বের কারণ ও সম্ভাব্য সময় বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছিল, যা বুধবার মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হলো।

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ৫ বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল বাংলাদেশ। তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ৫ জন এমপি-মন্ত্রীর কোম্পানিসহ ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর একচেটিয়া কাজ দেওয়া হয়। যা ‘সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিতি পায়। সরকারিভাবে কর্মী প্রতি খরচ ৭৯ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও, এই সিন্ডিকেটের কারণে সাড়ে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল কর্মীদের কাছ থেকে। দুই দেশের প্রভাবশালী চক্র এই অর্থ হাতিয়ে নেয়, যার মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল মালয়েশিয়ার একটি পক্ষের হাতে। এর আগে ২০১৫ সালেও একইভাবে সিন্ডিকেট করে সাধারণ কর্মীদের পকেট কাটা হয়েছিল।

২০১৮ এবং ২০২৪ এই দুই দফায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সিন্ডিকেটের চক্করে পড়ে বাংলাদেশের এক লাখেরও বেশি কর্মী চরম প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং দেশ থেকে অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

বিগত সময়ে সিন্ডিকেট মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার বাজার খোলেনি। বর্তমান সরকার শ্রমবাজার চালুর চেষ্টা চালালেও আবারও নেপথ্যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই চক্রটি এতটাই শক্তিশালী এবং এর পেছনে মাল্টি-লেয়ারের (বহু স্তরের) খেলোয়াড়রা জড়িত যে, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী চাইলেও এই সিন্ডিকেট ভাঙা বেশ জটিল।

এমন একটি সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে আরও দায়িত্বশীল ও বুঝেশুনে বক্তব্য দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করছেন অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টরা। মন্ত্রীর কথার ওপর ভিত্তি করে কোনো সরল কর্মী যদি টাকা দিয়ে প্রতারিত হন, তবে তার দায়ভার এড়ানোর কোনো সুযোগ থাকবে না।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন