সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

ডিসেম্বরেই দলবল নিয়ে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতে চান শেখ হাসিনা

সংক্ষিপ্ত সার বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি এবং দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর, ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেছেন যে তিনি এবং তাঁর দলের জ্যেষ্ঠ সহকর্মীরা আগামী

সংক্ষিপ্ত সার

  • ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশি নেত্রী রয়টার্সকে বলেছেন, দেশে ফিরলে তাঁর প্রাণনাশের ঝুঁকি রয়েছে।
  • শেখ হাসিনা জানান, স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার পর তিনি এবং তাঁর দলের সহকর্মীরা আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।
  • মৃত্যুদণ্ডাদেশ থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি বলে জানান হাসিনা।
  • আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি হাসিনার।

বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি এবং দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর, ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেছেন যে তিনি এবং তাঁর দলের জ্যেষ্ঠ সহকর্মীরা আগামী ডিসেম্বরের দিকে ভারত থেকে নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার এবং আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী নেত্রী বলেছেন, তিনি এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের সদস্যরা স্বেচ্ছায় সেই দেশে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন যা তাঁরা দুই বছর আগে ছেড়ে পালিয়েছিলেন। আদালতে নিজেদের সোপর্দ করার মাধ্যমে তাঁরা মূলত বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশিষ্ট রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি দেশটির আচরণ কেমন হয়, তা পরীক্ষা করতে চান।

বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী হাসিনা বলেন, “আমার ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেফতার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “তবুও আমাকে যেতে হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীরা চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যু আসেই, আমি চাই তা আমার নিজের দেশের মাটিতে আসুক, যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছে।”

নির্বাসনের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন

২০২৪ সালে তীব্র বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা তাঁর ২০ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যান। একটি ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে মারাত্মক দমনপীড়নের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে দেশটির যুদ্ধাপরাধ আদালত গত নভেম্বরে তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। নির্বাসন থেকে তিনি অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পোশাক রপ্তানিকারক এই দেশটির দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে যখন সরকার স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখন শেখ হাসিনার এই প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করতে পারে। অন্যদিকে, এটি ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক হতে পারে, যা নয়াদিল্লি তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার পর থেকে ঢাকার সঙ্গে মারাত্মকভাবে অবনতি হয়েছিল।

বাংলাদেশ বারবার ভারতকে তাঁকে প্রত্যর্পণ (ফেরত পাঠানোর) করার জন্য তাগিদ দিয়ে আসছে।

নির্বাসনে থাকার সময় শেখ হাসিনা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিলেও, এর আগে কখনো সরাসরি কোনো সাক্ষাৎকার দেননি। এবারই প্রথম তিনি তাঁর ফেরার সময়সীমা নির্ধারণ করলেন এবং জানালেন যে তিনি নিজে ও নির্বাসিত অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতারা আত্মসমর্পণ করতে চান। উল্লেখ্য, তাঁদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। তবে রয়টার্স অন্য দলীয় সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করতে বা তাঁরা কোথায় আছেন তা নিশ্চিত করতে পারেনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকার কর্তৃপক্ষ “আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়, তারা আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে বারবার চিঠি পাঠাচ্ছে। আমি নিজেই ফিরে যাব।”

হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্ররা কোনো সাড়া দেননি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে গত এপ্রিলে মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছিল যে, তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ পরীক্ষা করে দেখছে এবং তারা “নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চায়।”

একসময়ের গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন, যার বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ

সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর পিতা ও স্বাধীনতার নেতা এবং পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য নিহত হওয়ার পর পাদপ্রদীপে আসা শেখ হাসিনা অর্ধশতাব্দী ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

প্রথম জীবনে তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন এবং ১৭ কোটি জনসংখ্যার এই মুসলিমপ্রধান দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার কৃতিত্ব পেয়েছিলেন। তবে তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে ভিন্নমত দমন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করার অভিযোগ ওঠে—যা তিনি সবসময়ই অস্বীকার করেছেন।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যে দমনপীড়নের কারণে তাঁর পতন ঘটেছিল, তাতে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়।

দিল্লির নির্বাসনস্থল থেকে শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, “আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি যে এবার আমি দেশে ফিরছি, এবং একদিন তোমরা সবাই আসবে। সবাই একসঙ্গে আমরা আদালতে আত্মসমর্পণ করব।”

তবে সুরক্ষার স্বার্থে ডিসেম্বরের ঠিক কোন তারিখে তিনি ফিরবেন বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে অস্বীকৃতি জানান।

“আমি বিচারে বিশ্বাস করি এবং আমার মনে হয়, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেই মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক—আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।”

‘জনগণকেই বিচার করতে দিন’, বললেন হাসিনা

গণমাধ্যম ও সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর থেকে অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী গ্রেফতার, আইনি মামলা এবং শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ হয়নি। “গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার—এসব গোপন আলোচনার বিষয় নয়।”

কারাগারে যাওয়া নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন উল্লেখ করে বলেন, এর আগেও তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়েছেন।

১৯৮১ সালে পিতার হত্যাকাণ্ডের পর নির্বাসন থেকে ফিরে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় তিনি বারবার আটক হন। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও দুর্নীতির অভিযোগে তিনি জেলে যান, পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগে তিনি মুক্তি পান।

এবার দেশ ছাড়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, জনতা তাঁর বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসার সময় তাঁর প্রাণনাশের হুমকি ছিল।

সরকারে থাকার সময় আওয়ামী লীগের ভুল হয়ে থাকতে পারে—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কোনো সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতেই পারে—কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে একটি সরকারের ভালো-মন্দ, সঠিক-ভুল বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।”

শেখ হাসিনা জানান, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাকর্মীদের সাথে অনলাইনে বৈঠক করেছেন।

তিনি বলেন, “তারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করে থাকতে পারে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন স্থগিত (নিষিদ্ধ) করা হবে? আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, তাহলে সিদ্ধান্ত জনগণই নিক।”

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন