দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা যশোর একসময় ‘চরমপন্থী জোন’ হিসেবে কুখ্যাত ছিল। আশির দশক থেকে শুরু করে দুই হাজার সালের পর পর্যন্ত এই অঞ্চলে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল), গণবাহিনী, নিউ বিল্পবী কমিউনিস্ট পার্টিসহ নামে-বেনামে একাধিক চরমপন্থী দল সক্রিয় ছিল। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন ও চাঁদাবাজির কারণে একসময় রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হয়েছিল বৃহত্তর যশোর। সময়ের ব্যবধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযানে চরমপন্থীদের সেই দাপট কমলেও, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে এই অঞ্চলে এখন ভিন্ন রূপে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো।
বিশেষ করে জেলার সীমান্তবর্তী ও প্রত্যন্ত এলাকা যেমন অভয়নগর, চৌগাছা ও শার্শাকে ‘নিরাপদ জোন’ হিসেবে বেছে নিয়েছে উগ্রপন্থীরা। এসব এলাকায় নামে-বেনামে মাদ্রাসা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান খুলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের টার্গেট করে গোপনে উগ্রবাদী ও শারীরিক কসরতের ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে।
মার্শাল আর্টের আড়ালে উগ্রবাদ: ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম
সম্প্রতি এই অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম (এফসিএস)’ নামের একটি সংগঠন। প্রকাশ্যে তারা ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে মার্শাল আর্ট ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়ার দাবি করলেও, আড়ালে তরুণদের উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত ৫ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া থেকে এই সংগঠনের প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবিরসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। গ্রেপ্তারদের মধ্যে আতাউল্লাহ শাহ নামে এক যুবক ছিলেন। যিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গাজীপুর মহানগরের যুগ্ম সদস্যসচিব। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর এনসিপি তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে।
সিটিটিসি সূত্রে জানা গেছে, মার্শাল আর্টের আড়ালে এই চক্রটি গোপন সংগঠনের নামে বায়াত (শপথ) গ্রহণ, কাল্পনিক শত্রুর মোকাবিলায় ‘ইদাদ’ (অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত করা) এবং সাংগঠনিক তহবিল সংগ্রহের জন্য ‘সারিয়া’ বা লুটের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত। এমনকি সাবিরের ব্যক্তিগত ডিভাইসে ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বা হাতে তৈরি বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের একাধিক ভিডিও পেয়েছে পুলিশ।
সংগঠনটির যশোর সিদ্ধিপাশা শাখার দায়িত্বশীল ও অ্যাডমিন আবদুল্লাহ আল মামুন উগ্রবাদে সম্পৃক্ততার দাবি অস্বীকার করলেও, মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাতে যশোর সদর উপজেলার কিসমত নোয়াপাড়া থেকে তাহসীন ইসলাম (১৯) নামে এক তরুণকে আটক করে জেলা ডিবি পুলিশ। তার ঘর থেকে একটি চাপাতি ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়। পুলিশ জানায়, তাহসীন এই এফসিএস সংগঠনের সঙ্গে জড়িত এবং ঢাকায় সিটিটিসি ইউনিটের দায়ের করা মামলার সূত্র ধরেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তহবিল সংগ্রহে ‘সারিয়া’ বা ডাকাতির পথ
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, উগ্রবাদীরা এখন তাদের কার্যক্রমের অর্থায়নের জন্য ডাকাতিকে ধর্মীয় পরিভাষায় ‘সারিয়া’ বা গণিমতের মাল আখ্যা দিয়ে জায়েজ করার চেষ্টা করছে। গত বছরের একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৭ জুলাই যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি ডাকাতি মামলা দায়ের করা হয়। যেখানে শাহ আমানত সাবিরসহ এফসিএসের একাধিক সদস্যকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার বাদী কমল বিশ্বাস সাংবাদিকদের জানান, ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে পরিচিত এক ব্যক্তি ও তার সহযোগীরা তার ইজিবাইক ভাড়া করে শহরতলীর লিচু বাগান এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে কালো পোশাক পরা একদল যুবক তাকে মুখ ও হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখে তার ইজিবাইক ও ফোন ছিনিয়ে নেয়। এই মামলায় আটক তাহসীন ইসলামও অন্যতম আসামি।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫-১৬ সালের দিকে আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতির ঘটনাতেও যেভাবে উগ্রবাদী সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গিয়েছিল, যশোরের এই চক্রটিও একই মডেলে ফান্ডিংয়ের জন্য ভিন্ন ধর্মের নাগরিকদের টার্গেট করছে।
সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিক্রমপুরীর তৎপরতা
যশোরের ঝিকরগাছা ও সীমান্তবর্তী এলাকায় আতাউর রহমান বিক্রমপুরী নামে এক উগ্রবাদী ধর্মীয় নেতার কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ‘বৈষম্যবিরোধী কারামুক্তি আন্দোলন’ নামে একটি ভুঁইফোড় সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এই সংগঠনের আড়ালে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রধান জসিম উদ্দীন রাহমানীসহ কয়েক শতাধিক সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন উগ্রবাদী নেতাকে কারাগার থেকে মুক্ত করার পেছনে তিনি ভূমিকা রেখেছেন।
কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার ভেঙে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিসহ বহু জঙ্গির পলায়ন এবং আইনি প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর গলে জামিনে বের হওয়া উগ্রপন্থীদের যশোর অঞ্চলে পুনর্বাসন ও তাদের মতাদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে বিক্রমপুরী পরোক্ষভাবে কাজ করছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে উঠে এসেছে। সীমান্তবর্তী ও হিন্দু অধ্যুষিত এই অঞ্চলে নদী ও সড়ক পথে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় উগ্রবাদীরা সহজেই তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করছে।
আফগানিস্তানের অনুকরণ ও মূলধারার উদ্বেগ
এই গোষ্ঠীর চরমপন্থী মনোভাবের আরেকটি বড় প্রমাণ মেলে তাদের ধর্মীয় আচার পালনে। গত ঈদুল ফিতরে বাংলাদেশের মূলধারার একদিন আগে, সৌদি আরবেরও আগে, কেবল ‘ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান’-এ চাঁদ দেখার ঘোষণা অনুসরণ করে ১৯ মার্চ যশোরের অভয়নগর এলাকায় ঈদের জামাত আদায় করেন শাহ আমানত সাবির ও তার অনুসারীরা। তারা আফগানিস্তানের তালেবান শাসন ব্যবস্থাকে আইডিয়াল মনে করে দেশে ‘তেহরিক-ই-তালেবান বাংলাদেশ (টিটিবি)’ গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গোয়েন্দা সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
উগ্রপন্থীদের এই নেটওয়ার্ক ও প্রচারণা প্রসঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম সাংবাদিকদের বলেন, উগ্রপন্থীদের খুবই ভয়ংকর একটি জাল রয়েছে। এদের মূল কথা হলো প্রচলিত বা নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন সম্ভব নয়, সশস্ত্র বিপ্লব করতে হবে। এরা মূলত ছাত্রশিবির বা ধর্মীয় তরুণদের টার্গেট করে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। আমরা সব সময় বলেছি, উগ্রপন্থার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বর্তমান সরকারের এই বিষয়ে উদাসীনতা উগ্রবাদীদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ করে দিচ্ছে।
ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ঝুঁকি
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঢাকায় দায়ের হওয়া মামলার সূত্র ধরে তারা স্থানীয়ভাবে অভিযান চালাচ্ছেন এবং আটককৃতদের সিটিটিসির কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। তবে তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় অনেক তথ্য এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আইএসের পতনের পর উগ্রবাদের যে হাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার দিকে মোড় নেওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল, যশোরের বর্তমান পরিস্থিতি তারই ইঙ্গিত দেয়। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়া এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে উগ্রবাদের এই ডালপালা ছড়ানো যদি এখনই কঠোর হস্তে দমন করা না যায়, তবে তা অদূর ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য স্থায়ী ক্ষত এবং চূড়ান্ত হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।