আইন, নৈতিকতা এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার সর্বোচ্চ চেয়ারে বসে সরকারি ঠিকাদারি ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার এক নজিরবিহীন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। যার মধ্যে তাঁর নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কাজও রয়েছে।
রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে প্রতিমন্ত্রীর এমন প্রকাশ্য ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা দেশের ক্রয় ব্যবস্থা, সুশাসন ও সাংবিধানিক স্পিরিটকে চরম প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মীর শাহে আলম বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই তাঁর পুত্র মীর শাখরুল আলম সীমান্তের মালিকানাধীন লাইসেন্সে মোট ১৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮ হাজার ৯৯১ টাকা মূল্যের ৬টি বড় সরকারি কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এই কাজগুলোর দরপত্র প্রক্রিয়ার সময়রেখাটি বিশ্লেষণ করলে প্রভাব বিস্তারের এক স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। ৬টি কাজের মধ্যে একটি কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ এবং বাকি ৫টি কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয় একই বছরের ২৫ মার্চ। পরবর্তীতে বিদ্যুৎ গতিতে যথাক্রমে ৬ এপ্রিল এবং ২৮ এপ্রিল সরকারের সঙ্গে এই কাজগুলোর আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিমন্ত্রীর ছেলের লাইসেন্সে কোটি কোটি টাকার কাজ চলে যাওয়ার এই ঘটনাকে সাধারণ কোনো কাকতালীয় বিষয় হিসেবে মানতে নারাজ সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
অনুসন্ধানের দ্বিতীয় বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ‘রুপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক)-কে লবণ শিল্পের জন্য আবশ্যিক উপাদান পটাশিয়াম আয়োডাইড বা আয়োডিন সরবরাহ করে থাকে। সরকারি আইন অনুযায়ী, দেশের সাধারণ লবণ উৎপাদনকারীরা বিসিকের বাইরে অন্য কোনো উৎস থেকে এটি কিনতে পারে না। ফলে এই সরবরাহ ব্যবস্থাটি ব্যবসায়িক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত একচেটিয়া এবং প্রভাব-নির্ভর।
সরকারি ই-জিপি নথির তথ্য বলছে, রুপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেড-এর সরাসরি অংশীদার স্বয়ং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং তাঁর ছেলে মীর শাখরুল আলম সীমান্ত। সেখানে বাবা ও ছেলের সমান ৫০ শতাংশ করে শেয়ার রয়েছে। যেখানে মীর শাহে আলম নিজে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং তাঁর ছেলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই পারিবারিক প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে কোটি কোটি টাকার কাজ পেয়েছে।
২০২৪ সালের ২৪ মে আওয়ামী লীগ আমলে ১৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকার কাজ। ২৫ সালের ১৭ জুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে ২১ কোটি টাকার কাজ। ২৬ সালের ১২ এপ্রিল মীর শাহে আলম প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর ২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকার নতুন কাজ করেন।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দাবি করেছেন, তিনি শপথ নেওয়ার পরপরই নৈতিকতার খাতিরে ব্যবসা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু সরকারি নথি ও যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর এর নথির তথ্য এই দাবির অসারতা প্রমাণ করে।
নথি অনুযায়ী, রুপসী রাইস মিলের ২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকার নতুন কাজের নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড বা কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল। আর এর ঠিক চার দিন পর, অর্থাৎ ১৬ এপ্রিল মীর শাহে আলম তড়িঘড়ি করে তাঁর ৫০ শতাংশ শেয়ার নিজের স্ত্রী মীর লাবুলী আক্তারের নামে হস্তান্তর করেন। অর্থাৎ, সরকারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের কাজ নিশ্চিত করার পরই কেবল কাগজে-কলমে মালিকানা পরিবর্তনের আইনি নাটক সাজানো হয়, যা মূলত প্রশাসনিক দায় এড়ানোর একটি কৌশল মাত্র।
সুশাসন ও স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে দরপত্র জমার ক্ষেত্রে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পাওয়া কাজগুলোর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে ‘সিঙ্গেল বিডিং’ বা একক দরদাতা হিসেবে। অর্থাৎ, যখনই এই প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে, সেখানে অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি অংশ নেয়নি বা নিতে পারেনি। সরকারি উন্মুক্ত ক্রয় ব্যবস্থায় বারবার একজনই বিড করা এবং কাজ পেয়ে যাওয়া একচেটিয়া সিন্ডিকেট ও প্রশাসনিক পক্ষপাতের স্পষ্ট আলামত বহন করে।
বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে প্রথমে প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর থেকে কোনো বক্তব্য দেওয়া হবে না বলে জানানো হলেও, গত ৯ জুন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মীর শাহে আলম। তিনি দাবি করেন, আমি আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই আমার ৪টি লিমিটেড কোম্পানি ও প্রোপ্রাইটরশিপ ব্যবসা স্ত্রী ও সন্তানের কাছে হস্তান্তর করে দিয়েছি। আমি এখন সরাসরি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নই। তবে হস্তান্তরের তারিখ এবং কাজ পাওয়ার রহস্যজনক সময়ক্রমের বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষমতার এই অপব্যবহার বাংলাদেশের সংবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন। দেশের সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীদের মতো সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারের সঙ্গে কোনো লাভজনক ব্যবসায়িক বা ঠিকাদারি সম্পর্কে জড়াতে পারবেন না।
আইনবিদদের মতে, আইনের কেবল শব্দ নয়, এর অন্তর্নিহিত দর্শন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিমন্ত্রী যদি তাঁর স্ত্রী বা সন্তানের নামে কোম্পানি লিখেও দেন, তবুও ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে সেই প্রভাববলয়কে ব্যবহার করে পারিবারিক লাভভোগের সুযোগ বহাল থাকে, যা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী। স্বার্থের এই স্পষ্ট সংঘাত প্রমাণিত হলে প্রতিমন্ত্রীর পদটিই আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক এই ঘটনাকে সুশাসন ও জবাবদিহির ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখছেন। তিনি স্পষ্ট জানান, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী ও সন্তান কোনোভাবেই সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারেন না কাগজে-কলমে ব্যবসা হস্তান্তর করা হলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়। অতীতের দুর্নীতিসহায়ক আইনি ফাঁকফোকর ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে ব্যবহার করে যেভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হতো, বর্তমান সরকারের সময়েও যদি সেই একই প্রবণতা বহাল থাকে, তবে তা রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংস্কার ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতির সাথে এক চরম প্রহসন।
‘প্রতিমন্ত্রী যখন সরকারি ঠিকাদার’ এই বাস্তবতা কেবল একটি পরিবারের বিপুল অর্থ উপার্জনের গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, জনক্রয় প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক নীতি লঙ্ঘনের এক উদ্বেগজনক দলিল। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে একক দরদাতা হিসেবে সরকারি অর্থ নিজেদের পকেটে তোলার এই সংস্কৃতির অবসান না হলে সুশাসনের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।