মহাবিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর ও স্পষ্ট ছবি প্রকাশ করে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে নাসার ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যুগান্তকারী এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে বাংলাদেশীদের জন্য এক বিরাট গর্বের খবর। বৈশ্বিক এই দূরদর্শী গবেষণা দলে গর্বিত সদস্য হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত জ্যোতির্বিজ্ঞানী লামিয়া আশরাফ মওলা।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে ১৩ শত কোটি বছর আগের সুদূর ছায়াপথের ঐতিহাসিক এই ছবি উন্মোচন করেন। মুহূর্তটিকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ছবি মহাবিশ্বের ইতিহাসের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ প্রকল্পে কর্মরত বিশ্বজুড়ে এক হাজারের বেশি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম হলেন লামিয়া। ২০২০ সাল থেকে তিনি এই প্রকল্পের কানাডিয়ান দলের সাথে যুক্ত আছেন। তিনি মূলতঃ দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা ছায়াপথগুলোর গঠন বিশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক কাঠামো (অ্যানালিসিস পাইপলাইন) তৈরির কাজ করেছেন।
অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে লামিয়া জানান, এই মুহূর্তের আনন্দ কোনো কিছুর সাথে তুলনীয় নয়। আগামীতে আরও অনেক নতুন ছবি প্রকাশ পাবে, আমরা ছায়াপথগুলোর বিস্তারিত জানতে এখন প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শুরু করব।
লামিয়া আশরাফ মওলা ঢাকার উইল্স লিট্ল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ও লেভেল এবং এ লেভেল সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। শুরুতে তার ইচ্ছা ছিল নিউরোসাইন্স নিয়ে পড়ার, তবে অন-ক্যাম্পাসে থাকা একটি টেলিস্কোপের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আকাশ দেখার অভিজ্ঞতাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলেসলি কলেজ থেকে অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে বিখ্যাত ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০২০ সাল থেকে তিনি কানাডার ‘ডানল্যাপ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’-এ ফেলো হিসেবে গবেষণা করছেন। ১৫ সদস্যের কানাডিয়ান দলে তিনি একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণার পরিবেশ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই তরুণ বিজ্ঞানী মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ দেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণায় বেশি জোর দেওয়া উচিত এবং সরকারকে গবেষণার সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে হবে। একই সাথে শিক্ষার্থীদের বেশি বেশি প্রশ্ন করার উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেলিস্কোপ আমদানির মাধ্যমে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সহায়তা করার উদ্যোগ নিলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন বলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, দেশে গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ থাকলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিদেশে পাড়ি জমাবে না।
বিজ্ঞানে বাংলাদেশী নারীদের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে লামিয়া বলেন, আমাদের দেশের ছাত্রীরা যেকোনো চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। শুধু তাদের বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। নিজের এই দীর্ঘ ও সফল যাত্রার মূল প্রেরণা হিসেবে তিনি তার মায়ের নিঃশর্ত সমর্থন ও অবদানের কথা স্মরণ করেন।