সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

খুঁটিতে বেঁধে স্ত্রীর সামনেই যুবলীগ নেতাকে হত্যা, মুখে প্রস্রাব!

মৃত্যুর আগে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে একটুখানি পানির জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা (৪০)। কিন্তু নির্মমতার চরম সীমা ছাড়িয়ে খুনিরা তাকে পানি তো

মৃত্যুর আগে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে একটুখানি পানির জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা (৪০)। কিন্তু নির্মমতার চরম সীমা ছাড়িয়ে খুনিরা তাকে পানি তো দেয়ইনি, উল্টো মুখে প্রস্রাব করে দিয়েছে বিএনপি নেতার ছেলে। আর চোখের সামনে স্বামীকে বাঁচাতে খুনিদের পা ধরেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি স্ত্রী মায়া খাতুন। নির্দয় ও অমানবিক ভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে ওই যুবলীগ নেতাকে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকাল ১০টার দিকে যশোরের চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের মুক্তদাহ গ্রামের মোড়ে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

নিহত জুয়েল রানা মুক্তদাহ গ্রামের আব্দুল ওয়াদুদের ছেলে। তিনি পাতিবিলা ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। এই ঘটনায় স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে বিএনপি ক্যাডারদের হামলায় আহত হয়েছেন স্ত্রী মায়া খাতুনও।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গের সামনে নিহত জুয়েলের স্ত্রী মায়া খাতুনের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি ঘটনার যে বিবরণ দিয়েছেন, তা যেকোনো মানুষের বিবেককে নাড়া দেবে।

মায়া খাতুন জানান, সকালে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ওই সময় আমার স্বামী মুক্তদাহ মোড়ে চা খেতে যায়। সেখানে তাকে ধরে মারধর শুরু করে বিএনপির নেতারা। খবর পেয়ে আমি ছুটে গেলে খুনিরা আমাকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। আমার চোখের সামনে স্বামীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে দুই পা ভেঙে দেয়। মৃত্যুর আগে আমার স্বামী পানির তৃষ্ণায় আকুতি করতেছিল, একটু পানি চাটছিল। কেউ তাকে পানি দেয়নি। উল্টো বিএনপি নেতা নজরুল মেম্বারের ছেলে বাবু আমার স্বামীর মুখে প্রস্রাব করে দেয়! আমি পা ধরেও আমার স্বামীকে বাঁচাতে পারলাম না।

হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে মায়া খাতুন জানান, এলাকায় বিএনপি নেতা নজরুল ও তার ছেলে বাবুসহ অন্যরা চাঁদাবাজি করতো। জুয়েল এই চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় তাকে এভাবে নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাতিবিলা ইউনিয়নটি বিএনপি-অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মারপিট ও মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ ছিল জুয়েলের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জুয়েল এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এলাকায় ফেরেন।

গত বুধবার রাতে পাতিবিলা ইউনিয়নের সদস্য (মেম্বার) ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি নজরুল ইসলামসহ স্থানীয় বিএনপি নেতাদের নিয়ে জুয়েল নানা সমালোচনা করেন। এর জেরে বৃহস্পতিবার সকালে মুক্তদাহ মোড়ে বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম, তার ছেলে বাবুসহ ছয়-সাত জন দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে জুয়েলের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। তারা জুয়েলকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে এবং পিটিয়ে দুই হাঁটুর নিচ থেকে ভেঙে দেন।

গুরুতর অবস্থায় স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করলে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জুয়েলের মৃত্যু হয়।

জুয়েলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই অভিযুক্ত বিএনপি নেতা নজরুল মেম্বার ও তার ছেলে বাবুসহ সহযোগীরা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। বক্তব্য নেওয়ার জন্য নজরুল ইসলামের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। এই ঘটনার পর থেকে মুক্তদাহ গ্রামসহ পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

পাতিবিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান লাল বলেন, “জুয়েল আওয়ামী লীগের সময়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মারপিট ও মামলার আসামি করাসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করেছে। তার প্রতি বিএনপির অনেকে ক্ষুব্ধ ছিলেন।” তবে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম।

চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশিদ বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। জুয়েলের বিরুদ্ধে মারামারির ঘটনাসহ তিনটি মামলা রয়েছে। তবে তার স্ত্রীকে বেঁধে রাখার বিষয়টি আমাদের জানা নেই।

তিনি আরও জানান, বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে জুয়েলের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইতিমধ্যে কয়েকজনকে থানায় আনা হয়েছে এবং মূল জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন