খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং তার সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও প্রতীকী পুত্তলিকা দহন কর্মসূচি পালন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। একইসঙ্গে তারা অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো রকম আপস না করে স্থায়ী বহিষ্কারসহ কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদি চত্বরে এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে এ প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংহতি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন।

সমাবেশ চলাকালে শিক্ষার্থীরা ‘দফা এক দাবি এক, রেজাউলের বহিষ্কার’, ‘যৌন হেনস্তাকারীর ঠিকানা এই ক্যাম্পাসে হবে না’ সহ বিভিন্ন স্লোগানে পুরো ক্যাম্পাস মুখরিত করে তোলেন। সমাবেশ শেষে শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত শিক্ষকের প্রতীকী পুত্তলিকায় অগ্নিসংযোগ করেন।
সমাবেশে এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিমেষ দে বলেন, অতীতে বিভিন্ন ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলেও আমরা তেমন কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। আমরা এই শিক্ষকের স্থায়ী বহিষ্কার চাই।
আরেক শিক্ষার্থী তানভীর বিন মুহিত বলেন, একজন শিক্ষক তার অবস্থান ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের প্রতি অনৈতিক আচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হলে তা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উদ্বেগজনক। আমরা এই শিক্ষককে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দেখতে চাই না। তাকে স্থায়ী বহিষ্কার না করলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হব।
এর আগে গত মঙ্গলবার দুপুরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পক্ষে শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্ত্যক্তকরণের মেসেজসম্বলিত প্রমাণপত্রসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
অভিযোগে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী উল্লেখ করেন, শুরুতে ওই শিক্ষক তার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করলেও ধীরে ধীরে মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ ও অস্বস্তিকর বার্তা পাঠাতে শুরু করেন। প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া নথিপত্রে দেখা যায়, ওই শিক্ষক ভুক্তভোগীকে “আই লাভ ইউ মোর দ্যান আই ক্যান সে”, “আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না”, “আজ থেকে ভালোবাসা শুরু হোক”, “তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে দুনিয়ায় কম আছে”—ইত্যাদি আপত্তিকর ও অনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠানোর পরদিনই তিনি তা গ্রহণ করে বার্তা পাঠানো শুরু করেন। শুরুতে প্রভাবশালী এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পেলেও, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রয়োজন মনে করেই আমি সামনে এসেছি। আমি চাই এ ঘটনার এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থীকে এই পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্র ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। তদন্তের স্বার্থে ও প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযুক্ত শিক্ষক ড. মো. রেজাউল ইসলামকে ডিসিপ্লিন প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলাম। তিনি জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসে তার মোবাইল ফোনটি হারিয়ে যায় এবং এরপর থেকেই তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট অপব্যবহার হয়ে থাকতে পারে।
তবে শিক্ষকের এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, মোবাইল হারানোর কথা বলা হলেও ওই সময়ের পরও তার আইডি থেকে একাধিকবার একাডেমিক বিষয়ে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। এমনকি সম্প্রতি তিনি নিজের প্রোফাইল থেকে গবেষণা-সংক্রান্ত সংবাদও শেয়ার করেছেন।
এদিকে এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। ক্যাম্পাস জুড়ে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং শিক্ষার্থীরা তদন্ত কমিটির দ্রুত ও নিরপেক্ষ রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছেন।