ইতালির রাজধানী রোমে পরকীয়াজনিত বিরোধের জেরে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশিকে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রধান ঘাতক ও সন্দেহভাজন হিসেবে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার নাম ও ছবি প্রকাশ করেছে ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওই নেতার সাথে নিহত প্রবাসীর স্ত্রীর দীর্ঘদিনের অবৈধ পরকীয়া সম্পর্ক ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
গত শুক্রবার (২৬ জুন) ইতালির স্থানীয় সময় রাত প্রায় ৯টার দিকে রোমের পশ্চিমাঞ্চলের অরেলিও এলাকার ভিয়া মন্টিগ্লিও সড়কের একটি পার্কে এই বর্বরোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটে। রোমে বসবাসরত নিহতদের নিকটাত্মীয় হোসনেয়ারা বেগম এবং ইতালির পুলিশ প্রশাসন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত মো. শাহাদাত হোসেন (৪৩) নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব এবং উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। ১৯৮৩ সালের ১০ মে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করা এই নেতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং পরকীয়ার জেরে পুরো একটি পরিবারকে ধ্বংস করার অভিযোগ উঠেছে।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তার স্ত্রী মমতাজ বেগম আরজু (৩৮) এবং তাদের শিশু কন্যা আরওয়া ইসলাম আরিশা (৫)। এই একই হামলায় কামালের বড় ছেলে আমির হোসেন অয়ন (১৮) গুরুতর আহত হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
নিহত কামালের গ্রামের বাড়ির লোকজন ও ইতালি প্রবাসীদের একাধিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশে থাকাকালীনই কামালের স্ত্রী আরজুর সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা শাহাদাতের অবৈধ পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শাহাদাতের এই অনৈতিক তৎপরতা নিবৃত্ত করতে না পেরে এবং নিজের সংসার বাঁচাতে দুই বছর আগে কামাল উদ্দিন তার স্ত্রী ও সন্তানদের ইতালি নিয়ে যান।
এদিকে, চার বছর আগে শাহাদাতের স্ত্রী নিজেদের সম্পত্তি বিক্রি করে শাহাদাতকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যান। কিন্তু যুক্তরাজ্যে গিয়েও মমতাজ বেগম আরজুর সঙ্গে পরকীয়ার জেরে স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে প্রেমিকা আরজু ইতালি চলে যাওয়ার খবর পেয়ে শাহাদাতও যুক্তরাজ্য ছেড়ে অবৈধভাবে ইতালিতে পাড়ি জমান এবং সেখানেও আরজুর পিছু নেন।
শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে স্বামী কামাল উদ্দিন রোমের বাসায় স্ত্রী আরজুর এই অবৈধ পরকীয়ার চূড়ান্ত ফয়সালা করতে প্রেমিক শাহাদাতকে ডেকে বৈঠকে বসেন। এ সময় কামালের দুই সন্তানও উপস্থিত ছিল। বৈঠকের একপর্যায়ে বাগবিতণ্ডা শুরু হলে ক্ষিপ্ত ও হিংস্র হয়ে ওঠে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা শাহাদাত। সে সাথে আনা ধারালো ছুরি দিয়ে একে একে প্রেমিকা আরজু, তার স্বামী কামাল উদ্দিন এবং ৫ বছরের নিষ্পাপ শিশু আরিশাকে নির্বিচারে কোপাতে ও ছুরিকাঘাত করতে থাকে। ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। কামালের ছেলে অয়ন মারাত্মক আহত অবস্থায় কোনোমতে পালিয়ে জীবন রক্ষা করে।
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরপরই খুনি শাহাদাত হোসেন নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি পৈশাচিক স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।
এই স্ট্যাটাস এবং তদন্তের পর শনিবার (২৭) ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শাহাদাত হোসেনকে প্রধান খুনি ও সন্দেহভাজন উল্লেখ করে তার ছবি প্রকাশ করে আন্তর্জাতিকভাবে খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। রোম কোয়েস্টের মোবাইল টিম খুনি শাহাদাতকে ধরিয়ে দিতে বা তার অবস্থান জানাতে একটি জরুরি নম্বর (৩৩৪৬৯০৩২৯৫) চালু করেছে।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শামসুদ্দিন হায়দার দাবি করেছেন, ৪ বছর আগে যুক্তরাজ্য যাওয়ার পর থেকে দলের সঙ্গে শাহাদাতের সম্পৃক্ততা নেই। তবে শাহাদাতের পদত্যাগ বা দল থেকে অব্যাহতির কোনো লিখিত প্রমাণ বা দলিল তিনি দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে, শাহাদাতের বড় ভাই সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন জানান, চার বছর আগে বাড়ির সব সম্পত্তি বিক্রি করে দেশ ছাড়ার পর থেকে পরিবারের সাথেও শাহাদাতের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
রাজনৈতিক পরিচয়ধারী এই নেতার এমন পৈশাচিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রোমে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দেশের গ্রামের বাড়িতে চরম ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে। ঘাতক শাহাদাতকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে ইতালির আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা।