সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

বেরোবির সাবেক ভিসি গ্রেফতারের আড়ালে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য ও ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি অধ্যাপক মো. হাসিবুর রশীদকে গ্রেফতারের আড়ালে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য ও ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি অধ্যাপক মো. হাসিবুর রশীদকে গ্রেফতারের আড়ালে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর অভিযোগ উঠেছে। গ্রেফতারের আগে তাকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে ৩০ লাখ টাকা আদায় করা হলেও, সেই টাকা ভাগাভাগির সময় বড় ধরনের জালিয়াতি ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বের জেরে পুরো ঘটনাটি ফাঁস হয়ে গেছে।

ইতিমধ্যেই টাকা ভাগাভাগির একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা ও একাধিক অডিও রেকর্ড মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আবু সাঈদ হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি বেরোবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. হাসিবুর রশীদ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডে তাঁর শ্যালিকার বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন। দুই দিন আগে দুপুর বেলা একদল স্থানীয় লোক বিষয়টি টের পেয়ে ওই বাড়িটি ঘেরাও করে এবং ভিসিকে আটকে রাখে।

অভিযোগ উঠেছে, ভিসিকে আটকে রাখার পর পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে নগদ ৩০ লাখ টাকা আদায় করা হয়। উক্ত বাসার ম্যানেজার এবং সলিমুল্লাহ রোডের চিহ্নিত সন্ত্রাসী পারভেজ এই বিপুল পরিমাণ টাকার লেনদেনে মধ্যস্থতা করে। টাকা আদায়ের পরও ক্ষান্ত হয়নি তারা। ‘মব’ বা উত্তেজিত জনতার তকমা লাগিয়ে রাত পর্যন্ত ভিসির সাথে দফায় দফায় দেনদরবার করা হয়। ততক্ষণে ঘটনাস্থলে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ পৌঁছে গেলে রাতে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয়।

ঘটনার আসল নাটক শুরু হয় টাকা আদায়ের পর তা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করার সময়। মূল সমন্বয়কারী পারভেজ ভিসি হাসিবুর রশীদের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা নিলেও, টাকা ভাগ করার সময় অন্যদের কাছে দাবি করে যে মাত্র ১০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে।

৩০ লাখ টাকা রাতারাতি ১০ লাখ টাকা হয়ে যাওয়ার এই ‘হিসাব জালিয়াতি’র বিষয়টি বাকি অংশীদারদের মধ্যে জানাজানি হলে চরম ক্ষোভ ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে টাকা ভাগাভাগির এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের খবর পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং পুলিশ প্রশাসনের কান পর্যন্ত পৌঁছায়।

টাকা আত্মসাৎ ও ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে কে কত টাকা পেয়েছে, তার একটি লিখিত তালিকা তৈরি করে মোহাম্মদপুর থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়েছে ক্ষুব্ধ পক্ষেরই কেউ। সেই চাঞ্চল্যকর তালিকাটি হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো, স্থানীয় ছাত্রদল ১ লাখ টাকা, বিজয় ২ লাখ টাকা, স্থানীয় যুবদল ১.৫২ লাখ টাকা, সলিমুল্লাহ রোড মাঠের পোলাপাইন ১ লাখ টাকা,রবিন ১ লাখ টাকা, পারভেজ (মূল হোতা) ১.৫ লাখ টাকা, পুলিশ ৫০ হাজার টাকা, আলো-ফরহাদ ভাই ও রাসেদ ৭০ হাজার টাকা, জাবেদ মন্ডল ৩০ হাজার টাকা, রাজ ভাই ৩০ হাজার টাকা।

বেরোবির সাবেক ভিসিকে আটকে রেখে অর্থ আদায়ের পর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগের ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ ঘটনার সত্যতা আংশিক স্বীকার করেছে।

থানার একাধিক কর্মকর্তা জানান, আমরাও লোকমুখে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে এমন একটি ঘটনার কথা শুনেছি। স্থানীয় একাধিক ছাত্রদল এবং বিএনপির নেতাও বিষয়টি ফোন দিয়ে পুলিশকে জানিয়েছেন। এমনকি ৩০ লাখ টাকা নিয়ে ১০ লাখ টাকা বণ্টন করার যে তথ্যটি চাউর হয়েছে, সেটিও পুলিশের নজরে এসেছে। লিখিত তালিকাটির সত্যতা এবং এর সাথে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সাবেক ভিসিকে ‘মব’ বা জনরোষের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার একাধিক অডিও রেকর্ড এবং তথ্যপ্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সরজমিনে অনুসন্ধানের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা ভেরিফাই করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন কিংবা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কোনো তদন্ত সংস্থা যদি এই চাঁদাবাজি ও জালিয়াতির ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে চান, তবে দালিলিক প্রমাণাদি সরবরাহের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে।

একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেফতারের সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক লেবাসধারী এবং অপরাধীদের এমন প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ও অর্থ লোপাটের ঘটনায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল অবিলম্বে এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন