সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে নিয়ে দুটি মারাত্মক অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রথমটি হলো, তিনি একজন ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’; এবং দ্বিতীয়টি হলো হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’ উপন্যাসে বর্ণিত টঙ্গীর একটি বিতর্কিত নারী নির্যাতন বা ধর্ষণকাণ্ডের খলনায়ক মূলত তিনিই।
প্রকৃত নথিপত্র, ঐতিহাসিক বইয়ের সাক্ষাৎকার এবং সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দুটি দাবিই চরম তথ্যগত বিভ্রান্তি এবং ‘নামের মিল’ থাকার সুযোগ নিয়ে তৈরি করা সুনিপুণ গুজব।
আ ক ম মোজাম্মেল কি সত্যিই ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’?
মাসখানেক আগে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিএনপির প্রবীণ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকার দাবি করেন, আ ক ম মোজাম্মেল হক কোনো যুদ্ধই করেননি এবং তিনি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।
যুগান্তরের প্রতিবেদনে দাবি করা হয় মোজাম্মেল হক কোথায় যুদ্ধ বা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তার স্পষ্ট বর্ণনা দেননি। অথচ, ২০০৪ সালে প্রকাশিত বিলু কবিরের বিখ্যাত ‘গাজীপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ বইয়ের ২৫৯-২৬০ পৃষ্ঠায় আ ক ম মোজাম্মেল হকের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার রয়েছে। সেখানে তিনি নিজেই স্পষ্ট করে গেছেন যে, ১৯৭১ সালে তাঁর ‘সশস্ত্র যুদ্ধে’ সরাসরি অংশ নেওয়া হয়নি। তিনি মূলত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন এবং গোকুলনগরে ‘ক্যাম্প ইনচার্জ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশের আইন ও নিয়ম অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে যারা সরাসরি অস্ত্র হাতে লড়াই করেননি কিন্তু ভারতে বা দেশের অভ্যন্তরে ক্যাম্প পরিচালনা, যুব শিবির নিয়ন্ত্রণ এবং সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁরাও ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবেই রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত।
তিনি যে একেবারেই মাঠে ছিলেন না, তা নয়। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ গাজীপুরের জয়দেবপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। যুগান্তরের সেই প্রতিবেদনেই হাসান উদ্দিন সরকার নিজেই স্বীকার করেছেন ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ গাজীপুরের জয়দেবপুরে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে আ.ক.ম. মোজাম্মেল হকও ছিলেন।
সুতরাং, তিনি নিজেকে কখনো ‘সম্মুখ সমরের বীর’ দাবি করেননি। তিনি একজন সংগঠক ও প্রতিরোধ যোদ্ধা ছিলেন। যা তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা সনদের পূর্ণ অধিকার দেয়।
‘দেয়াল’ উপন্যাসের মোজাম্মেল কি এই মোজাম্মেল?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’ উপন্যাসের একটি অধ্যায়ের রেফারেন্স টেনে দাবি করেছেন, উপন্যাসে বর্ণিত টঙ্গীর সেই কুখ্যাত ধর্ষণকাণ্ডের হোতা হলেন সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল।
এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভুল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’ উপন্যাসের ৮৫ নম্বর পৃষ্ঠায় যে ঘটনার বিবরণ রয়েছে, তা স্পষ্টভাবেই টঙ্গী এলাকার ঘটনা। আর এই ঘটনার চরিত্রটি সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল নন, বরং তিনি হলেন টঙ্গীর তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী মোজাম্মেল।
বিলু কবিরের বইয়ের ২৬৯ পৃষ্ঠা অনুযায়ী, ৭১ সালে কাজী মোজাম্মেল ছিলেন টঙ্গী থানার ফাউন্ডার সেক্রেটারি এবং টঙ্গী শ্রমিক লীগের প্রেসিডেন্ট। তিনি ছিলেন টঙ্গী অঞ্চলের কমান্ডার।
অন্যদিকে পৃষ্ঠা ২৪৯ অনুসারে আ ক ম মোজাম্মেল ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁর বাড়ি টঙ্গী এলাকায় নয়, বরং গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ।
মজার ব্যাপার হলো, ২০০৪ সালে বিলু কবিরের বইয়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে (পৃষ্ঠা-২৭৬) এই হাসান উদ্দিন সরকার নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি টঙ্গী অঞ্চলে ‘কাজী মোজাম্মেল’কে কমান্ডার হিসেবে মানেন। একই বইয়ের ২৭৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, গাজীপুরের একশো-দেড়শো শ্রমিক সংগঠিত হয়েছিল আ ক ম মোজাম্মেলদের অধীনে আর টঙ্গীর শ্রমিকরা সংগঠিত হয়েছিল কাজী মোজাম্মেল ও হাসান সরকারের অধীনে।
এমনকি বিখ্যাত ঐতিহাসিক আর্কাইভ ‘সংগ্রামের নোটবুক’-এর নথিতেও গাজীপুরের মুক্তিযুদ্ধে আ ক ম মোজাম্মেল এবং কাজী মোজাম্মেল এই দুই ব্যক্তির আলাদা নাম, ভিন্ন অবস্থান ও স্বতন্ত্র অবদানের কথা স্পষ্টাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে।
কথিত আছে, সত্তরের দশকে শ্রমিক ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে কাজী মোজাম্মেলের নামে এই ‘ধর্ষণকাণ্ডের’ গল্পটি সাজানো হয়েছিল। উপন্যাসে যে মেজর নাসেরের কথা বলা হয়েছে, তিনি ১৯৭২-৭৫ সময়ে দেশেই ছিলেন না। এমনকি ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও এই ঘটনা নিয়ে মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। ফলে মূল ঘটনাটিই ছিল একটি রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা।
ইতিহাসের ৩ জন প্রমিলেণ্ট ‘মোজাম্মেল’
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গাজীপুর ও ঢাকা অঞ্চলে মূলত ৩ জন প্রভাবশালী ও আলোচিত ‘মোজাম্মেল’ রয়েছেন, যাদের নাম গুলিয়ে ফেলে প্রায়শই বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়
সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক , ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চের প্রতিরোধ যোদ্ধা এবং গোকুলনগর ক্যাম্পের ইনচার্জ (সংগঠক)। টঙ্গী অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কমান্ডার কাজী মোজাম্মেল, যাঁর নাম জড়িয়ে হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’ উপন্যাসের ঐ বিতর্কিত অধ্যায়টি রচিত হয়েছে। গুলশান-ভাটারা এলাকার ক্র্যাক প্লাটুনের দুঃসাহসী গেরিলা যোদ্ধা মোজাম্মেল হক (বীর প্রতীক)। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানকে তাঁর নিজস্ব গুলশানের বাসভবনে ঢুকে গুলি করেছিলেন এবং সেই গুলিতেই মোনায়েম খান নিহত হন।
নথিপত্র ও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের সেই ‘মোজাম্মেল’ নন। নামের আংশিক মিল এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়ার সুবাদে ইতিহাসের দুটি ভিন্ন চরিত্র ও ঘটনাকে এক করে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।