সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

কিংবদন্তি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি আর নেই

যশোরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন সর্বস্তরের মানুষের ঢল বৃহত্তর যশোরের মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) প্রধান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর নায়ক, তুখোড় ছাত্রনেতা ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ

যশোরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন

সর্বস্তরের মানুষের ঢল


বৃহত্তর যশোরের মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) প্রধান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর নায়ক, তুখোড় ছাত্রনেতা ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ আলী হোসেন মনি আর নেই। শুক্রবার ভোর সাড়ে ছয়টায় ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট যশোর জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা ও শ্বাসকষ্টসহ বার্ধক্যজনিত নানাবিধ রোগে ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গোটা যশোর জেলাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। মৃত্যুকালে তিনি একমাত্র কন্যা, পুত্রবধূ, পুতনি, আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও সহযোদ্ধা রেখে গেছেন।

ভোরে হাসপাতাল থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনির মরদেহ শহরের রেল বাজার সংলগ্ন তাঁর নিজ বাসভবনে নেওয়া হলে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রিয় নেতা ও সহযোদ্ধাকে শেষবার দেখতে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে।

সেখানে ছুটে যান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম, জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, সাবেক পৌর মেয়র মারুফুল ইসলাম, জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি ও মুজিব বাহিনীর উপপ্রধান রবিউল আলমসহ প্রতিবেশী ও রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

এরপর বাদ আসর যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে মরহুমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার পূর্বে জেলা প্রশাসনের পক্ষে স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক রফিকুল হাসান মরহুমের কফিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন। এরপর পুলিশের একটি চৌকস দল এই বীর সেনানীকে ‘গার্ড অব অনার’ বা রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান ও জানাজা শেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনিকে সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কাজীপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর প্রয়াত ছেলের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

মরহুমের জানাজায় স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষ শরিক হন। এসময় উপস্থিত ছিলেন, স্থানীয় সরকারের পরিচালক ও যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান, সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামীম হুসাইন, জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, মুজিব বাহিনীর উপপ্রধান রবিউল আলম, বাসদ নেতা হাসিনুর রহমান, জেলা জাসদের সহসভাপতি আহসান উল্লাহ ময়না, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আবুল কায়েস, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার এ এইচ এম মুযহারুল ইসলাম মন্টু, বর্তমান সদস্য সচিব আব্দুল মালেক, যশোর ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ স্বপন, নাট্যকলা সম্পাদক আলমগীর হোসেন বাবু, যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা একরাম উদ দ্দৌলা, জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. এনামুল হক, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সম্পাদক তসলিম উর রহমান, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের (জেইউজে) সভাপতি সাজেদ রহমান, সাবেক সভাপতি সাজ্জাদ গনি খান রিমন, বীর মুক্তিযোদ্ধা জন্মবার্ষিকী উদযাপন পর্ষদ যশোরের আহ্বায়ক হারুন অর রশিদ, সদস্য সচিব আনোয়ারুল করীম সোহেল, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু, উদীচী যশোরের সভাপতি অ্যাড. আমিনুর রহমান হিরু, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব, যশোর সাহিত্য পরিষদের সভাপতি শাহীন ইকবাল, বিবর্তন যশোরের সভাপতি নওরোজ আলম খান চপল, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন অমিত, জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির অনুপ কুমার পিন্টু এবং কর্নেল জামিল স্মৃতি সংসদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন দোদুলসহ প্রমুখ।

ঈদগাহ ময়দানে মরহুমের কফিনে জেলা প্রশাসন ছাড়াও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জেলা জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড, বীর মুক্তিযোদ্ধা জন্মবার্ষিকী উদযাপন পর্ষদ এবং যশোরের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ শ্রদ্ধা নিবেদন করে। সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল, যশোর ইনস্টিটিউট পরিচালনা পরিষদ, ইনস্টিটিউট নাট্যকলা সংসদ, উদীচী যশোর, চাঁদের হাট, কিংশুক, তির্যক, স্পন্দন, পুনশ্চ, জেলা পূজা উদযাপন পর্ষদ এবং বাঘারপাড়া মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ।

এছাড়া যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের (জেইউজে) সভাপতি সাজেদ রহমান ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন এক যৌথ বিবৃতিতে গভীর শোক ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

আলী হোসেন মনি জীবদ্দশায় যিনি বৃহত্তর যশোরের এক অপরাজেয় কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ১৯৪৬ সালের ১৭ জানুয়ারি যশোর সদর উপজেলার কাজিপুর বলাডাঙ্গা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রয়াত রফিউদ্দিন এবং মাতা প্রয়াত মনোয়ার বেগম। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তিনি যশোর মুসলিম একাডেমি থেকে এসএসসি, যশোর মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজ থেকে এইচএসসি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ষাটের দশকে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তুখোড় রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি যশোর জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি একরামুল কবিরের সাথে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা আসার পর তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ব্যাচে ভারতের দেরাদুনে বিশেষ সামরিক ও গেরিলা যুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। এরপর তিনি বৃহত্তর যশোরের মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) প্রধান বা আঞ্চলিক অধিনায়ক হিসেবে সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন। তাঁর সুনিপুণ রণকৌশলের কাছে যশোরাঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাস্ত হতে বাধ্য হয়। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং দীর্ঘদিন জেলা জাসদের সভাপতি ছিলেন। দলের বিভক্তির পর তিনি জাসদ (ইনু) অংশের জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে জাসদ ঐক্যবদ্ধ হলে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন। জেলা আওয়ামী লীগের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থাকলেও দলের একজন শীর্ষ অভিভাবক ও নিবেদিতপ্রাণ নেতা হিসেবে প্রতিটি নির্বাচনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখতেন।

ব্যক্তিগত জীবনে আলী হোসেন মনি গভীর শোকের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী এবং একমাত্র পুত্রসন্তান রাজেন আলী রাজু বেশ কয়েক বছর আগেই প্রয়াত হন। শেষ সময়ে বাবার জটিল অসুস্থতার খবর পেয়ে কানাডা থেকে দেশে ছুটে আসেন তাঁর একমাত্র কন্যা ফারজানা আলী। তিনি সার্বক্ষণিক বাবার পাশে থেকে দেখভাল করছিলেন।

গত ১২ মে শহরের রেল বাজারস্থ বাসভবনে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে যশোর জেনারেল হাসপাতালের সিসিইউতে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ধানমন্ডি পপুলার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে চিকিৎসকদের পরামর্শে পুনরায় যশোরে এনে গত ৮ জুন আবার জেনারেল হাসপাতালের সিসিইউতে এবং অবস্থার অবনতি হলে ৯ জুন রাতে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই আজ সকালে চিরবিদায় নেন এই মহানায়ক।

উল্লেখ্য, আগামী ২০২৭ সালের ১৭ জানুয়ারি আলী হোসেন মনির ৮০তম জন্মবার্ষিকী ব্যাপক আয়োজনে দেশব্যাপী উদযাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা জন্মবার্ষিকী উদযাপন পর্ষদ, যশোর’। কিন্তু সেই মাহেন্দ্রক্ষণের আগেই নিভে গেল এক মহিমান্বিত ও সংগ্রামী জীবনের আলো। তাঁর এই চলে যাওয়া যশোর তথা সমগ্র বাংলাদেশের আপামর জনতার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন