সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

রাজনীতির আড়ালে উগ্রবাদের ডালপালা ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ঝুঁকি

গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগ নিয়ে উগ্রবাদী ও নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে

গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগ নিয়ে উগ্রবাদী ও নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কিনা তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার ভেঙে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিসহ বহু জঙ্গির পলায়ন এবং জামিনে বা অন্য উপায়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের মুক্তি পাওয়ার ঘটনা দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকিকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

বিবিসির গত বছরের (২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) তথ্য অনুযায়ী, কাশিমপুর কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৫৩ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তসহ ১৫১ জন আসামির খোঁজ এখনো মেলেনি। এর মধ্যে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমির মতো ব্যক্তিদের পলায়ন এবং বিষয়টি দীর্ঘ সময় আড়ালে থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইনি প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর গলে কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে উগ্র মতাদর্শী ব্যক্তিরা যেভাবে প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পাচ্ছে, তা সাধারণ নাগরিকদের ভেতর ভীতি তৈরি করছে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো উগ্রপন্থার প্রকাশ্য প্রচার ও স্বাভাবিকীকরণ। অতীতে সুন্নি ও সুফি মতাদর্শীদের ওপর হামলার হুমকি কিংবা ভিন্নমতাবলম্বী ও ব্লগারদের খুনের তালিকা নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তিদের সামাজিক মাধ্যমে এক ধরনের ‘হিরো’ বা অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব বানানোর চেষ্টা চলছে। দেশের বেকার ও বিভ্রান্ত যুবসমাজের একটি অংশকে এইএসআই, আল-কায়েদা কিংবা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর মতো আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী গোষ্ঠীর আদলে জিহাদ ও নাশকতার পথে ধাবিত করার সুপ্ত চেষ্টা মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান।

ইতিহাস মুছে ফেলার প্রবণতাও এখানে স্পষ্ট। গুলশান হামলার স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার পর তা নতুন করে পুনর্নির্মাণ না করা উগ্রপন্থীদের এক ধরনের পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক বিজয় এনে দেয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছুটা কঠোর অবস্থান আশার আলো দেখাচ্ছে। ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস)-এর প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবিরসহ ৬ কর্মীকে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি এর বড় প্রমাণ। উগ্রবাদী কার্যক্রমে জড়িত থাকার দায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গাজীপুর মহানগর কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আতাউল্লাহ শাহকে দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হলেও প্রশ্ন থেকে যায় দলের ভেতরে এত সহজে এরা কীভাবে জায়গা করে নেয়?

সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খানের প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানী ভিডিও ফুটেজে এফসিএস-এর যে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে, তা গা শিউরে ওঠার মতো। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস’ (আইইডি) বা হাতে তৈরি বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ এবং সেই ভিডিও দেশের বাইরে পাঠানো, কিংবা যশোরের শারীয়ার দোহাই দিয়ে অমুসলিম নাগরিকদের স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি করার প্রমাণ সবই ইঙ্গিত করে যে উগ্রবাদীরা এখন তাদের কার্যক্রমের জন্য ফান্ডিং বা অর্থায়নের পথ হিসেবে ডাকাতিকে বেছে নিচ্ছে। এর আগে ২০১৫-১৬ সালের দিকে আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতির ঘটনাতেও একই ধরনের উগ্রবাদী সংশ্লিষ্টতা দেখা গিয়েছিল।

সিরিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আইএস-এর পতনের পর বিশ্লেষকরা যে আশঙ্কা করেছিলেন উগ্রবাদের এই হাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার দিকে মোড় নিতে পারে তা আজ বাংলাদেশের বাস্তবতায় যেন সত্য হতে চলেছে। বিগত কয়েক বছরে মূলধারার মিডিয়া ও তথাকথিত ‘মোজো’ (মোবাইল জার্নালিজম) সাংবাদিকদের একাংশের অতি-উত্তেজনাপূর্ণ কন্টেন্ট, গালিগালাজ এবং নৃশংসতাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এক ধরনের সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে উগ্রপন্থীরা জেল থেকে বের হয়ে অনলাইন ও অফলাইনে আরও বেশি ফলোয়ার ও অন্ধ সমর্থক পেয়ে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক দল ও বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। উগ্রবাদ কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর ক্ষতি করে না, এটি পুরো সমাজের স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের ডামাডোলে যদি উগ্রবাদকে দমন করা না যায়, তবে এই গোষ্ঠীগুলো ভবিষ্যতে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এখনই কঠোর ও নিরপেক্ষ আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে এদের শিকড় উপড়ে ফেলা জরুরি।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন