আজ ১৬ জুলাই, বরেণ্য সাংবাদিক শামছুর রহমানের ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০০ সালের এই দিনে দৈনিক জনকণ্ঠের যশোর অফিসে কর্মরত অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন তিনি। সাংবাদিক মহলে ‘কেবল’ ডাকনামে পরিচিত শামছুর রহমানকে বলা হতো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তথ্যভাণ্ডার এবং ‘চলমান কম্পিউটার’। বিশেষ করে ভারতীয় রাজনীতি নিয়ে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও বিশ্লেষণের কারণে জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ ভারতের সাধারণ নির্বাচন কাভার করার জন্য তাঁকেই মনোনীত করে পাঠাতো।
শামছুর রহমান হত্যাকাণ্ডের ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও অধরাই রয়ে গেছে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার। এই দীর্ঘ বিচারহীনতার নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং মামলার তদন্ত নিয়ে নানামুখী কূটকৌশলকে দায়ী করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগে শামছুর রহমান তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে স্পষ্ট লিখে গিয়েছিলেন যে, তৎকালীন বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলাম তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছেন। তবে রহস্যজনকভাবে মামলার এজাহার ও চার্জশিটে তরিকুল ইসলামকে আসামি করা হয়নি। পরবর্তীতে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর মামলার গতিপথ সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে মোড় নেয়।
মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৬ জন আসামির মধ্যে অন্যতম ছিল তরিকুল ইসলামের দেহরক্ষী ‘পাগলা শহীদ’, যে সরাসরি জনকণ্ঠ অফিসে ঢুকে শামছুর রহমানকে গুলি করেছিল। বিএনপি সরকার গঠনের পর তরিকুল ইসলাম কারাগারে থাকা আসামিদের মুক্ত করার ব্যবস্থা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পলাতক পাগলা শহীদ দিল্লিতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হলেও, তরিকুল ইসলাম তাকে কড়া পাহারায় রাখেন এবং সুকৌশলে বিপুল অর্থ দিয়ে পুনরায় বিদেশে পাঠিয়ে দেন যাতে সে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে না পারে।
বিএনপি সরকারের আমলে তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের প্রভাবে মামলার ‘বর্ধিত তদন্তের’ নামে দৈনিক ইত্তেফাকের তৎকালীন যশোর অফিস প্রধান ফারাজী আজমল হোসেনকে নতুন করে আসামি করা হয়। এই পদক্ষেপের পর ফারাজী আজমল হোসেন ইত্তেফাকের তৎকালীন কর্নধার ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের আইনি সহায়তায় উচ্চ আদালত থেকে মামলার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন। এরপর থেকে বিগত পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে মামলাটি আর আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি আওয়ামী লীগের দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সময়েও এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমানে তরিকুল ইসলামের ছেলে সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফেসবুকে প্রবীণ সাংবাদিক ফজলুল বারী এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের এক রোমহর্ষক ও বেদনাবিধুর স্মৃতিচারণ করেছেন। জনকণ্ঠে শামছুর রহমানের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি লেখেন, জনকণ্ঠে একসঙ্গে কাজ করার সূত্রে শামছুর রহমানের সঙ্গে আমার একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাঁর তত্ত্বাবধানে আমি সেই সময়ে সাড়া জাগানো প্রতিবেদন ‘রক্তাক্ত জনপদ’ ও ‘আতঙ্কিত খুলনা’র মতো সিরিজ রিপোর্ট করেছিলাম। প্রতিদিন ফোনে তাঁর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ হতো। রিপোর্ট লিখে ভুল সংশোধনের জন্য তাঁকে আমি ফোনে পড়ে শোনাতাম।
তিনি আরও জানান, ‘আতঙ্কিত খুলনা’ সিরিজটি প্রকাশের সময় একটি কুখ্যাত কিলার গ্রুপ টাকা ও অস্ত্র নিয়ে ঢাকায় আসে প্রতিবেদনটি বন্ধ করার জন্য। জনকণ্ঠের তৎকালীন প্রধান প্রতিবেদক ও নগর সম্পাদক আব্দুল খালেকের সাথে কিলারদের এক রহস্যময় যোগাযোগ তৈরি হয় এবং খালেক সাহেব রিপোর্টটি বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
ফজলুল বারী বিষয়টি শামছুর রহমানকে জানালে, শামছুর রহমান পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খানের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করেন এবং রিপোর্টটি পুনরায় প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। রিপোর্ট চালু হওয়ার সেই রাতেই শামছুর রহমান ফোনে ফজলুল বারীকে আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে। রিপোর্ট আমি যে আবার চালু করেছি এটা তারা জেনে গেছে। এর ঠিক পরের রাতেই নিজ কার্যালয়ে খুন হন শামছুর রহমান।
ফজলুল বারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পত্রিকা অফিসে কোনো অসৎ দুর্নীতিবাজ লোক থাকলে যে একজন সাংবাদিক খুন হতে পারেন, এ ঘটনা তা প্রমাণ করে। এই কষ্ট আজও আমি বয়ে বেড়াচ্ছি।
হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তার কারণে ফজলুল বারীকে শামছুর রহমানের জানাজা, দাফন বা কুলখানিতেও অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু ট্রাস্টের মাধ্যমে শামছুর রহমানের দুই মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং জনকণ্ঠ পত্রিকাও বিমা ও বেতনের অর্থ দিয়ে পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছিল। তবে আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা মিললেও, ২৬ বছর ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে মেধাবী ও সাহসী এই সাংবাদিক হত্যার বিচার আজও ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছে।