ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি নিয়ে প্রচলিত একটি দীর্ঘদিনের মিথ বা জনশ্রুতি হলো এই বিশাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নবাব সলিমুল্লাহর দান করা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে ঐতিহাসিক তথ্যের চেয়েও অকাট্য দলিল হিসেবে পরিচিত ‘সিএস জরীপ’ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভূখণ্ডের দাগগুলোতে নবাব সলিমুল্লাহর নাম মালিক হিসেবে রেকর্ডভুক্ত নেই।

উল্লেখ্য, ১৯১২ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনামলে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সিএস রেকর্ড সম্পন্ন হয়েছিল। সেই রেকর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো যে দাগের ওপর অবস্থিত, সেখানে মালিক হিসেবে সাধারণ নাগরিক ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র জোতদারের নাম পাওয়া গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সিএস রেকর্ডের তথ্য বলছে, কলাভবন ও ক্যাফেটেরিয়া (দাগ নং ২০৮) এই দাগের অধীনে মালিক হিসেবে যাদের নাম রেকর্ডভুক্ত হয়েছে তারা হলেন উপেন্দ্র, অখণ্ড কুমার, বিহারিলাল, আব্দুর রহমান ব্যাপারী, মোতোয়াল্লি, রামনারায়ণ, ইসমাইল শেখ, জয়নব বেওয়া, শেখ হাবলু এবং ছন্নু কাহার।
আর্টস লাইব্রেরি, মসজিদ ও মধুর ক্যান্টিনের আশপাশ (দাগ নং ৪৮) এই বিস্তীর্ণ এলাকায় মালিক হিসেবে রেকর্ডভুক্ত ছিলেন, জামাল, হর সুন্দরী দাস্যা, শেখ ইয়াসিন, মো. তাহের, মনোহর চন্দ্র, শশী মুখী দাস্যা, গোপার চন্দ্র দাস, কৃষ্ণ মোহন দাস, আমিরুন্নেসা, আব্দুল বারেক, ফকির চাঁদ, বিহারিলাল পাল, চারু চন্দ্র গুহ, ওসমান কুলু, ফক্কু বেওয়া, আলা বক্স, মতিলাল পোদ্দার, খোদা হাফেজ, নওয়াব আলী এবং সোবহান চৌধুরী।
মধুর ক্যান্টিন ও আইবিএ (দাগ নং ৪৭) এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত ছিল। এছাড়া রেকর্ড অনুযায়ী এখানে মালিকানার সাথে যুক্ত ছিলেন রাধারানী বেওয়া ও আলী মোহাম্মদ।
ইতিহাসবিদদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে নবাব সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক অবদান অনস্বীকার্য। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম এবং পরবর্তীতে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর পূর্ব বাংলার মানুষের শিক্ষার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তবে জমি প্রদানের ক্ষেত্রে আইনি দলিলে তাঁর নাম না থাকায় গবেষকরা মনে করছেন, জমিটি হয়তো সরাসরি দান নয় বরং সরকারি খাস জমি বা অধিগ্রহণকৃত সাধারণ মানুষের মালিকানাধীন জমি ছিল।
পরবর্তীতে ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া এসএ রেকর্ড এবং ম্যাপ পর্যালোচনা করলে মালিকানার এই চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জমির মালিকানার হিসেব এবং ম্যাপ ভিত্তিক বিশ্লেষণ পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
সিএস রেকর্ডের এই তথ্যগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে গবেষণার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। তথাকথিত “দানকৃত জমি”র মিথ থেকে বেরিয়ে এসে দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-সম্পত্তির ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখছে এই তথ্যসূত্রগুলো।