সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পূর্ণ প্রতিবেদন

অনিয়মের স্বর্গরাজ্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

সাভারের সবুজ ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একসময় পরিচিত ছিল প্রাণচাঞ্চল্য আর মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ঘটে

সাভারের সবুজ ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একসময় পরিচিত ছিল প্রাণচাঞ্চল্য আর মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ঘটে যাওয়া একের পর এক ঘটনা প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা এবং ক্যাম্পাসের ভঙ্গুর নিরাপত্তাব্যবস্থাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম মোল্লাকে প্রক্টর অফিসের ভেতরে প্রক্টরের উপস্থিতিতেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি ক্যাম্পাসের ভেতরে শুরু থেকেই এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে।

ক্যাম্পাসের ভেতরে গতিরোধক ও শৃঙ্খলা না থাকায় প্রাণ দিতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। ২৪ সালের নভেম্বর মাস আফসানা করিম রাচি মার্কেটিং বিভাগের এই শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে ব্যাটারিচালিত রিকশার ধাক্কায় নিহত হন। ২৫ সালে জোবায়ের হোসাইন অসুস্থ অবস্থায় জরুরি চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স পেতে বিলম্ব হওয়ায় অকালেই ঝরে যায় এই মেধাবী প্রাণ। রাকিব নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে মৃত্যু হয় এই শ্রমিকের। যা ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবকে স্পষ্ট করে।

ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ ক্যাম্পাসে কর্মরত ইন্টারনেট কর্মী প্রীতম রায় এবং ২০২৬-এ শারমিন জাহান নামে একজনের রহস্যজনক রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার হয় ইসলামনগরের বাসা থেকে। এমনকি জাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের অবহেলায় একজন শিক্ষিকার মৃত্যুর অভিযোগও উঠেছে। যা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের প্রতিটি স্তরে নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে দিয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। ২০২৫ সালে এক বহিরাগত যুবক ছাত্রীদের আবাসিক হলে ঢুকে পড়লে প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার (১২ মে) রাতে ঘটে যাওয়া ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।

মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন নির্জন রাস্তায় এক ছাত্রীকে গলার জালের মতো বস্তু পেঁচিয়ে ঝোপে টেনে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। ভুক্তভোগী কোনোমতে নিজেকে বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।

ক্যাম্পাসের এই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আগে যেখানে সামান্য কোনো ঘটনায় শিক্ষার্থীরা মশাল মিছিল নিয়ে প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করত। সেখানে বর্তমান প্রশাসনের অধীনে একের পর এক মৃত্যু ও অপরাধ ঘটলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন নেই। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন এই প্রশাসন কি তবে কোনো ‘অদৃশ্য ক্ষমতার’ জোরে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে?

জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম জানান, ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্কের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার রেজিস্ট্রার ভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করা হবে। তবে প্রশাসনের উদাসীনতার পাশাপাশি ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্য না থাকাকেও অনেকে অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

৫ আগস্ট পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশে’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ক্যাম্পাসের স্বপ্ন দেখলেও, বাস্তবতা হয়েছে তার উল্টো। পিটিয়ে হত্যা থেকে শুরু করে ধর্ষণচেষ্টা সব মিলিয়ে জাবি এখন যেন এক অনিয়মের স্বর্গরাজ্য। প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে এই ‘অনাচার ও অবিচারের’ সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

আরও পড়ুন